০১:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

নাগরিক সুবিধাদি নিশ্চিতকল্পে ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা

Fahim Mondol

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল: আমাদের শহর বা নগর কাঠামোর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম প্রশাসনিক অঞ্চল ‘ওয়ার্ড’। মতভেদে সংজ্ঞার পার্থক্য থাকলেও, সাধারণভাবে স্থানীয় সরকারে জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত এবং বৃদ্ধি করতে কোনো সিটি কর্পোরেশন কিংবা পৌরসভাকে যেসব নির্বাচনি ইউনিটে বিভক্ত করা হয়, সেসব এলাকাকে ওয়ার্ড বলা হয়। প্রত্যেক ওয়ার্ড থেকে একজন করে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে থাকেন। আয়তন ও জনসংখ্যার মানদণ্ডে ক্ষুদ্রতম প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বিবেচিত হলেও সরকারের অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনায় ‘ওয়ার্ড’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আর তাই বলা হয়ে থাকে সর্বস্তরের নাগরিক সুবিধাদি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা।

ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা কী? যে প্রক্রিয়ায় কোনো পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন হতে প্রাপ্য সম্ভাব্য সিংহভাগ নাগরিক সুবিধাদি স্বীয় ওয়ার্ড এলাকাতেই লাভ করবেন, সেটিই ওয়ার্ডভিত্তিক নগর পরিকল্পনা। ভিন্নার্থে বলতে গেলে, অন্তর্ভূক্তিমূলক নগর উন্নয়নের দর্শনে শহরের সকল এলাকার প্রতি সমান গুরুত্ব প্রদান পূর্বক পরিকল্পনা করার নামই ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা।

ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা: মূলত, আমাদের শহরগুলোতে বসবাসরত জনসাধারণের টেকসই এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনার প্রয়োজন। আমাদের দেশের বেশিরভাগ শহরই অপরিকল্পিত নগরায়নের মারাত্মক পরিণতি লালন করে টিকে রয়েছে। বড় শহরগুলোর প্রায় সবই বর্তমানে বসবাসের অযোগ্য স্থানে পরিণত হবার দ্বারপ্রান্তে। এসব শহরকে পুনরায় বাসযোগ্য করতে হলে, বিশেষ দু-একটা অঞ্চলের উন্নতি নয়, বরং দেশের সব অঞ্চলকে নিয়েই ভাবা দরকার। সেজন্যেই দেশের প্রতিটি পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনে স্থানিকভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনার ছক কষতে হবে। এছাড়াও, শহরের ঐতিহাসিক ভবন, স্থাপনা, খেলার মাঠ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার্থে এবং বনভূমির পরিমাণ বাঁড়াতে ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নগর পরিকল্পনায় ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে করণীয়: নতুন শহর তৈরির ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি এবং জ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে বিশদ পরিকল্পনাপূর্বক সেই শহরকে নতুন আঙ্গিকে সাজানো সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে বড় শহর এবং নগর গুলোতে ইতোমধ্যে হাজারো-লক্ষ মানুষ স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। শুধুমাত্র আমাদের ঢাকা শহরেই প্রায় দুই কোটির উপর মানুষের বসবাস এবং বসবাসের স্থান হিসেবে ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে অনুপযোগী শহরের শীর্ষে। অতএব বোঝাই যাচ্ছে, আমাদের নগরগুলোকে একবারে ঢেলে সাজানো সম্ভব নয়। তাই আমাদের শহরগুলোতে ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে নগর পরিকল্পনায় কিছু বিষয়কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় আনতে হবে। সেগুলো পর্যায়ক্রমে নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • ওয়ার্ড ভিত্তিক বাজেট: সিটি বা পৌর বাজেট তৈরি করার সময় স্থানিক অর্থ বরাদ্দ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। খাতভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের বিপরীতে অঞ্চলভেদে যদি বাজেট বরাদ্দ করা হয়, তবে দুর্বল বা অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত অঞ্চলগুলো তাদের জন্য বেশি বাজেট বরাদ্দের জন্য দাবি করতে পারবে। এতে শহরের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
  • ওয়ার্ড ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা: ওয়ার্ড প্রোফাইল তৈরির মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক নাগরিক সেবা ও অবকাঠামোর বিদ্যমান অবস্থা এবং সম্ভাব্য করণীয়সমূহ নির্ধারণপূর্বক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা (পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা) গ্রহণ করে বার্ষিক বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামো পরিকল্পনা/ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান প্রণয়ন করে বাজেট পরিকল্পনা করতে হবে। নতুন ওয়ার্ডগুলোর নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
  • ওয়ার্ড কমপ্লেক্স তৈরি করা: পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের সকল ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অফিসগুলোকে পূর্ণাঙ্গ ওয়ার্ড কমপ্লেক্সে রূপান্তরের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় আনতে হবে। পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের যে সকল নাগরিক সুবিধাদি প্রদান করে থাকে, তার সিংহভাগ এই কমপ্লেক্স থেকে পরিচালনা করা সম্ভব। এখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি কমিউনিটি সেন্টার এবং লাইব্রেরি থাকতে পারে। এছাড়াও, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন ব্যাতীত অন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিক সুবিধা দিয়ে থাকে, যেমন: নগরস্বাস্থ্য-সেবা, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ প্রভৃতি, সেসবের একটি করে ছোট অফিস উক্ত কমপ্লেক্সে থাকতে পারে। সম্পত্তির মানচিত্রের হালনাগাদ উত্তোলন এবং ওয়ার্ড কমপ্লেক্স থেকে অন্যান্য যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
  • জনদূর্ভোগ কমাতে এলাকাভিত্তিক ‘উন্নয়ন তদারকি দল গঠন: এই ধরনের কমিটি বা দল গঠন করা গেলে, ওয়ার্ডে যেকোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নে ও স্বচ্ছতা বিধানে কাজ করবে উক্ত ‘উন্নয়ন তদারকি দল’। ওয়ার্ড ভিত্তিক বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিসমূহ কার্যকর করতে পারলে, এসব কার্যক্রম আরও সহজভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে।
  • মশানিধন, জলাবদ্ধতা নিরসন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার ওয়ার্ড ভিত্তিক সমাধান: বর্তমান বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীই শহরে বসবাস করেন। খোদ জাতিসংঘের ভাষ্য মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শহরে বাস করবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর শহুরে জনসংখ্যা বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ হবে।

নগরায়নের এই আধিক্যের ভিড়ে আমরা হারাচ্ছি আমাদের সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থাপনা। আমাদের দেশেই আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম অবহেলা এবং বিশৃঙ্খলা দেখতে পারি। ফলস্বরূপ পরিবেশে দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে দূষণ। নিত্য নতুন সব রোগ জীবাণু এবং সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে এসব আবর্জনা থেকে।

আমাদের দেশে সাধারণভাবে শহর গুলোর সব বর্জ্য নদীতে নিয়ে ফেলা হয়। ফলস্বরূপ দূষিত হচ্ছে আমাদের নদীগুলো, যা সর্বোপরি প্রভাব ফেলছে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও। আবার যত্রতত্রই আমরা দেখতে পাই খোলা ডাস্টবিন, যা থেকে প্রতিনিয়ত ছড়ায় দূর্গন্ধ।

তাই পরিবেশ এবং পরিবেশের উপাদনগুলোকে এভাবে যেন নষ্ট না হতে হয় এবং তা যেন আমাদের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি হুমকি স্বরূপ না হয়, এজন্য নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ওয়ার্ড ভিত্তিক সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা প্রোপার ড্রেনেজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। পাশাপাশি নগরের সৌন্দর্য্য বর্ধনেও ব্যাপক কাজে আসবে পরিকল্পনাটি।

  • মানুষ ও কমিউনিটিকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু করা: নগরের দরিদ্র ও বস্তিবাসীদের জন্য ওয়ার্ড কেন্দ্রিক নাগরিক পরিসেবা প্রদান করতে হবে। ওয়ার্ডে বসবাসরত জনসাধারণের পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কিত দুর্ভোগ নিরসনে রাস্তাঘাটের সংস্কার সহ প্রয়োজনীয় ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। গাড়ি পার্কিং এর জন্য পরিকল্পনা মোতাবেক নির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত জায়গা দিতে হবে। এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিশু, প্রৌঢ় ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। অনলাইনে কর ও ফিস প্রদানের ব্যবস্থা এবং সেবাপ্রাপ্তির ডিজিটালাইজেশন করতে হবে।
  • শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে পার্ক, খেলার মাঠ ও গণপরিসর নিশ্চিত করা: আমাদের দেশের অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট করে জবরদখল করে রাখা হয়েছে। সেখানে প্রকৃতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইচ্ছেমতো গড়ে তোলা হচ্ছে ইমারত, দালান-কোঠা।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে আজ আমরা একে একে আমাদের সবগুলো নদী হারাতে বসেছি। তাই, যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে এসব প্রাকৃতিক সম্পদকে পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে প্রতিটি শহরের নদী বা পানির আধার যখন স্বরূপে ফিরবে, তখন নদীর ধারের বায়ু শহরের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হবে।

প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতি তিন-পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে একটি করে ছোট কিংবা মাঝারি আয়তনের পার্ক এবং প্রতি দশ কিলোমিটার অন্তর একটি বড় পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে বিশুদ্ধ বায়ুতে শ্বাস নেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। এতে করে, এলাকার ছোট বাচ্চারা খোলা জায়গাতে খেলাধুলা করে মানসিক এবং শারীরিক বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে। সর্বোপরি সবার জন্য একটা বিনোদন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

এসবের পাশাপাশি কৃত্রিম উপায়ে কোনো এলাকা বা ওয়ার্ডকে সাজানোর মাধ্যমে সেটিকে জনমানসের জন্য উপকারী করে তোলা সম্ভব। যেমন, হাতির ঝিল প্রকল্প, ঢাকা।

  • পরিকল্পনাবিদগণের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রদান: নগর পরিকল্পনাবিদগণ আমাদের দেশে অনেকাংশেই কাজে বাঁধার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। রাজনৈতিক ভাবে কিংবা প্রশাসনিকভাবে নানা রকমের বাহ্যিক চাপের মুখ পরিকল্পনাবিদগণ প্রায়শই অসহায় হয়ে পড়েন এবং নিজেদের সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ঘটাতে পারেন না।

তাই ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের বিষয়টি নগর পরিকল্পনাতে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভূক্তিকরণ এবং সুষ্ঠু বাস্তবায়ন দেখতে চাইলে পরিকল্পনাবিদগণের হাতে অবশ্যই পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রদান করতে হবে এবং একই সঙ্গে কাজের তদারকি করার সুযোগ দিতে হবে। এতে পরিকল্পনাবিদগণ শহরের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজদের মতো করে পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবেন এবং সকল দিকে সমান গুরুত্ব দিতে পারবেন। তবেই কেবল শতভাগ নিশ্চয়তার সঙ্গে ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের পরিকল্পনা বাস্তবেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

এভাবে পৌরসভা কিংবা সিটি কর্পোরেশনের সকল সেবাগুলো ওয়ার্ড কাউন্সিল ভিত্তিক হতে হবে। সকল উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু ওয়ার্ড কাউন্সিল হলে একদিকে যেমন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে, অন্যদিকে নিশ্চিত হবে জনগণের মৌলিক অধিকার।

মহামারিতে ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের সুফল: আমাদের নগর বা শহর গুলোর প্রায় সব কার্যক্রমই কোনো বিশেষ জায়গাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। কিন্তু, করোনা মহামারি আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে শহুরে কেন্দ্রিকতার ভয়াবহ অবস্থা দেখিয়ে দিয়েছে। যদি প্রতিটি ওয়ার্ডে আবাসিক এলাকার পাশাপাশি একটি করে ‘বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তোলা হয়, তবে যেকোনো মহামারিতে অন্ততপক্ষে নাগরিক পরিষেবার অচলাবস্থা তৈরি হবে না। তাছাড়া, বিভিন্ন জনদুর্ভোগ কমাতেও বিষয়টি কাজে আসবে।

এসডিজি বাস্তবায়নে ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনার ভূমিকা: এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য প্রণীত হয়েছিলো সারা বিশ্বের মানুষের সার্বিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ এবং নিশ্চিতকল্পে। ২০১৫ সনের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ‘২০৩০ এজেন্ডা’ গৃহীত হয়। এর মেয়াদ ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল অবধি। এই পনেরো বছরে জাতিসংঘের আওতাভূক্ত রাষ্ট্রগুলোকে ১৭ টি লক্ষ্যমাত্রা এবং এর আওতাধীন ১৬৯ টি লক্ষ্য অবশ্যই পূরণ করতে বলা হয়েছে।

এসডিজির ১১ নং লক্ষ্যমাত্রায় বলা হয়েছে, অন্তর্ভূক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাত সহনশীল এবং টেকসই নগর ও জনবসতি গড়ে তুলতে হবে। আবার, এসডিজির ১৬ নং লক্ষ্যমাত্রায় বলা আছে, টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থার প্রচলন, সকলের জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ সুগম করা এবং সকল স্তরে কার্যকর, জবাবদিহিতাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ।

অন্যদিকে, ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য শহরগুলোতে বসবাসরত জনসাধারণের সকল নাগরিক সুবিধা ও টেকসই এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা; যা আদতে এসডিজির ১১ এবং ১৬ নং লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরাসরি কাজ করবে। তাই নগর পরিকল্পনায় ওয়ার্ড ভিত্তিক পরিকল্পনার বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করতে পারলে সকল প্রকার নাগরিক সুবিধাদি নিশ্চিতের পাশাপাশি এসডিজি বাস্তবায়নেও আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে বহুদূর।

পরিশেষে এটুকুই বলব, বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্র এবং আমরা এর নাগরিক। জিডিপির উত্তরোত্তর বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের দেশের জনসংখ্যাও ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। আমাদের দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার তাদের নির্বাচনি ইশতেহারেই বলেছে, ‘গ্রাম হবে শহর।’ অর্থাৎ, নাগরিক সুবিধাদি শহর থেকে এখন গ্রামেও সম্প্রসারণ করা হবে এবং শহরগুলোকেও যুগোপযোগী করে তোলা হবে।

এমতাবস্থায় আমাদের গ্রাম এবং শহরগুলোকে সাজানোর ক্ষেত্রে যদি আমরা ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনাকে গুরুত্ব না দিই এবং এটি নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ না গ্রহণ করি, তবে ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি শহরই হবে ঢাকার মতো বসবাসের চরম অযোগ্য নগরী এবং মানবমন ও শরীরের স্বাস্থ্য পড়বে চরম হুমকির মুখে।

আর যদি আমরা নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনার বিষয়টিকে অগ্রভাগে রেখে সার্বিক উন্নয়নে মনযোগী হই, তাহলে আমাদের অতিরিক্ত জনসংখ্যা অভিশাপ না হয়ে বরং আমাদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে পরিগণিত হবে। তাই নগর পরিকল্পনায় ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা পরিকল্পনাবিদ এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেহাদ 
ট্যাগ:

নাগরিক সুবিধাদি নিশ্চিতকল্পে ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা

প্রকাশ: ০৪:৪৪:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ জানুয়ারী ২০২২

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল: আমাদের শহর বা নগর কাঠামোর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম প্রশাসনিক অঞ্চল ‘ওয়ার্ড’। মতভেদে সংজ্ঞার পার্থক্য থাকলেও, সাধারণভাবে স্থানীয় সরকারে জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত এবং বৃদ্ধি করতে কোনো সিটি কর্পোরেশন কিংবা পৌরসভাকে যেসব নির্বাচনি ইউনিটে বিভক্ত করা হয়, সেসব এলাকাকে ওয়ার্ড বলা হয়। প্রত্যেক ওয়ার্ড থেকে একজন করে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে থাকেন। আয়তন ও জনসংখ্যার মানদণ্ডে ক্ষুদ্রতম প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বিবেচিত হলেও সরকারের অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনায় ‘ওয়ার্ড’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আর তাই বলা হয়ে থাকে সর্বস্তরের নাগরিক সুবিধাদি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা।

ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা কী? যে প্রক্রিয়ায় কোনো পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন হতে প্রাপ্য সম্ভাব্য সিংহভাগ নাগরিক সুবিধাদি স্বীয় ওয়ার্ড এলাকাতেই লাভ করবেন, সেটিই ওয়ার্ডভিত্তিক নগর পরিকল্পনা। ভিন্নার্থে বলতে গেলে, অন্তর্ভূক্তিমূলক নগর উন্নয়নের দর্শনে শহরের সকল এলাকার প্রতি সমান গুরুত্ব প্রদান পূর্বক পরিকল্পনা করার নামই ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা।

ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা: মূলত, আমাদের শহরগুলোতে বসবাসরত জনসাধারণের টেকসই এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনার প্রয়োজন। আমাদের দেশের বেশিরভাগ শহরই অপরিকল্পিত নগরায়নের মারাত্মক পরিণতি লালন করে টিকে রয়েছে। বড় শহরগুলোর প্রায় সবই বর্তমানে বসবাসের অযোগ্য স্থানে পরিণত হবার দ্বারপ্রান্তে। এসব শহরকে পুনরায় বাসযোগ্য করতে হলে, বিশেষ দু-একটা অঞ্চলের উন্নতি নয়, বরং দেশের সব অঞ্চলকে নিয়েই ভাবা দরকার। সেজন্যেই দেশের প্রতিটি পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনে স্থানিকভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনার ছক কষতে হবে। এছাড়াও, শহরের ঐতিহাসিক ভবন, স্থাপনা, খেলার মাঠ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার্থে এবং বনভূমির পরিমাণ বাঁড়াতে ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নগর পরিকল্পনায় ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে করণীয়: নতুন শহর তৈরির ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি এবং জ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে বিশদ পরিকল্পনাপূর্বক সেই শহরকে নতুন আঙ্গিকে সাজানো সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে বড় শহর এবং নগর গুলোতে ইতোমধ্যে হাজারো-লক্ষ মানুষ স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। শুধুমাত্র আমাদের ঢাকা শহরেই প্রায় দুই কোটির উপর মানুষের বসবাস এবং বসবাসের স্থান হিসেবে ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে অনুপযোগী শহরের শীর্ষে। অতএব বোঝাই যাচ্ছে, আমাদের নগরগুলোকে একবারে ঢেলে সাজানো সম্ভব নয়। তাই আমাদের শহরগুলোতে ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে নগর পরিকল্পনায় কিছু বিষয়কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় আনতে হবে। সেগুলো পর্যায়ক্রমে নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • ওয়ার্ড ভিত্তিক বাজেট: সিটি বা পৌর বাজেট তৈরি করার সময় স্থানিক অর্থ বরাদ্দ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। খাতভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের বিপরীতে অঞ্চলভেদে যদি বাজেট বরাদ্দ করা হয়, তবে দুর্বল বা অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত অঞ্চলগুলো তাদের জন্য বেশি বাজেট বরাদ্দের জন্য দাবি করতে পারবে। এতে শহরের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
  • ওয়ার্ড ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা: ওয়ার্ড প্রোফাইল তৈরির মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক নাগরিক সেবা ও অবকাঠামোর বিদ্যমান অবস্থা এবং সম্ভাব্য করণীয়সমূহ নির্ধারণপূর্বক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা (পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা) গ্রহণ করে বার্ষিক বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামো পরিকল্পনা/ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান প্রণয়ন করে বাজেট পরিকল্পনা করতে হবে। নতুন ওয়ার্ডগুলোর নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
  • ওয়ার্ড কমপ্লেক্স তৈরি করা: পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের সকল ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অফিসগুলোকে পূর্ণাঙ্গ ওয়ার্ড কমপ্লেক্সে রূপান্তরের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় আনতে হবে। পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের যে সকল নাগরিক সুবিধাদি প্রদান করে থাকে, তার সিংহভাগ এই কমপ্লেক্স থেকে পরিচালনা করা সম্ভব। এখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি কমিউনিটি সেন্টার এবং লাইব্রেরি থাকতে পারে। এছাড়াও, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন ব্যাতীত অন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিক সুবিধা দিয়ে থাকে, যেমন: নগরস্বাস্থ্য-সেবা, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ প্রভৃতি, সেসবের একটি করে ছোট অফিস উক্ত কমপ্লেক্সে থাকতে পারে। সম্পত্তির মানচিত্রের হালনাগাদ উত্তোলন এবং ওয়ার্ড কমপ্লেক্স থেকে অন্যান্য যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
  • জনদূর্ভোগ কমাতে এলাকাভিত্তিক ‘উন্নয়ন তদারকি দল গঠন: এই ধরনের কমিটি বা দল গঠন করা গেলে, ওয়ার্ডে যেকোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নে ও স্বচ্ছতা বিধানে কাজ করবে উক্ত ‘উন্নয়ন তদারকি দল’। ওয়ার্ড ভিত্তিক বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিসমূহ কার্যকর করতে পারলে, এসব কার্যক্রম আরও সহজভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে।
  • মশানিধন, জলাবদ্ধতা নিরসন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার ওয়ার্ড ভিত্তিক সমাধান: বর্তমান বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীই শহরে বসবাস করেন। খোদ জাতিসংঘের ভাষ্য মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শহরে বাস করবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর শহুরে জনসংখ্যা বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ হবে।

নগরায়নের এই আধিক্যের ভিড়ে আমরা হারাচ্ছি আমাদের সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থাপনা। আমাদের দেশেই আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম অবহেলা এবং বিশৃঙ্খলা দেখতে পারি। ফলস্বরূপ পরিবেশে দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে দূষণ। নিত্য নতুন সব রোগ জীবাণু এবং সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে এসব আবর্জনা থেকে।

আমাদের দেশে সাধারণভাবে শহর গুলোর সব বর্জ্য নদীতে নিয়ে ফেলা হয়। ফলস্বরূপ দূষিত হচ্ছে আমাদের নদীগুলো, যা সর্বোপরি প্রভাব ফেলছে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও। আবার যত্রতত্রই আমরা দেখতে পাই খোলা ডাস্টবিন, যা থেকে প্রতিনিয়ত ছড়ায় দূর্গন্ধ।

তাই পরিবেশ এবং পরিবেশের উপাদনগুলোকে এভাবে যেন নষ্ট না হতে হয় এবং তা যেন আমাদের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি হুমকি স্বরূপ না হয়, এজন্য নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ওয়ার্ড ভিত্তিক সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা প্রোপার ড্রেনেজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। পাশাপাশি নগরের সৌন্দর্য্য বর্ধনেও ব্যাপক কাজে আসবে পরিকল্পনাটি।

  • মানুষ ও কমিউনিটিকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু করা: নগরের দরিদ্র ও বস্তিবাসীদের জন্য ওয়ার্ড কেন্দ্রিক নাগরিক পরিসেবা প্রদান করতে হবে। ওয়ার্ডে বসবাসরত জনসাধারণের পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কিত দুর্ভোগ নিরসনে রাস্তাঘাটের সংস্কার সহ প্রয়োজনীয় ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। গাড়ি পার্কিং এর জন্য পরিকল্পনা মোতাবেক নির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত জায়গা দিতে হবে। এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিশু, প্রৌঢ় ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। অনলাইনে কর ও ফিস প্রদানের ব্যবস্থা এবং সেবাপ্রাপ্তির ডিজিটালাইজেশন করতে হবে।
  • শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে পার্ক, খেলার মাঠ ও গণপরিসর নিশ্চিত করা: আমাদের দেশের অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট করে জবরদখল করে রাখা হয়েছে। সেখানে প্রকৃতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইচ্ছেমতো গড়ে তোলা হচ্ছে ইমারত, দালান-কোঠা।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে আজ আমরা একে একে আমাদের সবগুলো নদী হারাতে বসেছি। তাই, যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে এসব প্রাকৃতিক সম্পদকে পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে প্রতিটি শহরের নদী বা পানির আধার যখন স্বরূপে ফিরবে, তখন নদীর ধারের বায়ু শহরের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হবে।

প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতি তিন-পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে একটি করে ছোট কিংবা মাঝারি আয়তনের পার্ক এবং প্রতি দশ কিলোমিটার অন্তর একটি বড় পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে বিশুদ্ধ বায়ুতে শ্বাস নেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। এতে করে, এলাকার ছোট বাচ্চারা খোলা জায়গাতে খেলাধুলা করে মানসিক এবং শারীরিক বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে। সর্বোপরি সবার জন্য একটা বিনোদন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

এসবের পাশাপাশি কৃত্রিম উপায়ে কোনো এলাকা বা ওয়ার্ডকে সাজানোর মাধ্যমে সেটিকে জনমানসের জন্য উপকারী করে তোলা সম্ভব। যেমন, হাতির ঝিল প্রকল্প, ঢাকা।

  • পরিকল্পনাবিদগণের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রদান: নগর পরিকল্পনাবিদগণ আমাদের দেশে অনেকাংশেই কাজে বাঁধার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। রাজনৈতিক ভাবে কিংবা প্রশাসনিকভাবে নানা রকমের বাহ্যিক চাপের মুখ পরিকল্পনাবিদগণ প্রায়শই অসহায় হয়ে পড়েন এবং নিজেদের সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ঘটাতে পারেন না।

তাই ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের বিষয়টি নগর পরিকল্পনাতে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভূক্তিকরণ এবং সুষ্ঠু বাস্তবায়ন দেখতে চাইলে পরিকল্পনাবিদগণের হাতে অবশ্যই পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রদান করতে হবে এবং একই সঙ্গে কাজের তদারকি করার সুযোগ দিতে হবে। এতে পরিকল্পনাবিদগণ শহরের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজদের মতো করে পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবেন এবং সকল দিকে সমান গুরুত্ব দিতে পারবেন। তবেই কেবল শতভাগ নিশ্চয়তার সঙ্গে ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের পরিকল্পনা বাস্তবেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

এভাবে পৌরসভা কিংবা সিটি কর্পোরেশনের সকল সেবাগুলো ওয়ার্ড কাউন্সিল ভিত্তিক হতে হবে। সকল উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু ওয়ার্ড কাউন্সিল হলে একদিকে যেমন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে, অন্যদিকে নিশ্চিত হবে জনগণের মৌলিক অধিকার।

মহামারিতে ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের সুফল: আমাদের নগর বা শহর গুলোর প্রায় সব কার্যক্রমই কোনো বিশেষ জায়গাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। কিন্তু, করোনা মহামারি আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে শহুরে কেন্দ্রিকতার ভয়াবহ অবস্থা দেখিয়ে দিয়েছে। যদি প্রতিটি ওয়ার্ডে আবাসিক এলাকার পাশাপাশি একটি করে ‘বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তোলা হয়, তবে যেকোনো মহামারিতে অন্ততপক্ষে নাগরিক পরিষেবার অচলাবস্থা তৈরি হবে না। তাছাড়া, বিভিন্ন জনদুর্ভোগ কমাতেও বিষয়টি কাজে আসবে।

এসডিজি বাস্তবায়নে ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনার ভূমিকা: এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য প্রণীত হয়েছিলো সারা বিশ্বের মানুষের সার্বিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ এবং নিশ্চিতকল্পে। ২০১৫ সনের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ‘২০৩০ এজেন্ডা’ গৃহীত হয়। এর মেয়াদ ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল অবধি। এই পনেরো বছরে জাতিসংঘের আওতাভূক্ত রাষ্ট্রগুলোকে ১৭ টি লক্ষ্যমাত্রা এবং এর আওতাধীন ১৬৯ টি লক্ষ্য অবশ্যই পূরণ করতে বলা হয়েছে।

এসডিজির ১১ নং লক্ষ্যমাত্রায় বলা হয়েছে, অন্তর্ভূক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাত সহনশীল এবং টেকসই নগর ও জনবসতি গড়ে তুলতে হবে। আবার, এসডিজির ১৬ নং লক্ষ্যমাত্রায় বলা আছে, টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থার প্রচলন, সকলের জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ সুগম করা এবং সকল স্তরে কার্যকর, জবাবদিহিতাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ।

অন্যদিকে, ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য শহরগুলোতে বসবাসরত জনসাধারণের সকল নাগরিক সুবিধা ও টেকসই এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা; যা আদতে এসডিজির ১১ এবং ১৬ নং লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরাসরি কাজ করবে। তাই নগর পরিকল্পনায় ওয়ার্ড ভিত্তিক পরিকল্পনার বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করতে পারলে সকল প্রকার নাগরিক সুবিধাদি নিশ্চিতের পাশাপাশি এসডিজি বাস্তবায়নেও আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে বহুদূর।

পরিশেষে এটুকুই বলব, বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্র এবং আমরা এর নাগরিক। জিডিপির উত্তরোত্তর বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের দেশের জনসংখ্যাও ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। আমাদের দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার তাদের নির্বাচনি ইশতেহারেই বলেছে, ‘গ্রাম হবে শহর।’ অর্থাৎ, নাগরিক সুবিধাদি শহর থেকে এখন গ্রামেও সম্প্রসারণ করা হবে এবং শহরগুলোকেও যুগোপযোগী করে তোলা হবে।

এমতাবস্থায় আমাদের গ্রাম এবং শহরগুলোকে সাজানোর ক্ষেত্রে যদি আমরা ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনাকে গুরুত্ব না দিই এবং এটি নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ না গ্রহণ করি, তবে ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি শহরই হবে ঢাকার মতো বসবাসের চরম অযোগ্য নগরী এবং মানবমন ও শরীরের স্বাস্থ্য পড়বে চরম হুমকির মুখে।

আর যদি আমরা নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে ওয়ার্ড ভিত্তিক নগর পরিকল্পনার বিষয়টিকে অগ্রভাগে রেখে সার্বিক উন্নয়নে মনযোগী হই, তাহলে আমাদের অতিরিক্ত জনসংখ্যা অভিশাপ না হয়ে বরং আমাদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে পরিগণিত হবে। তাই নগর পরিকল্পনায় ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা পরিকল্পনাবিদ এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেহাদ