০১:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

এখনও প্রাসঙ্গিক গ্রীক স্থাপত্যের তিন ক্রম

নওশীন নাওয়ার রাফা: মানব সভ্যতার বিকাশ ও ইতিহাসে গ্রীসের অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষা, সাহিত্য, ধর্ম, বিনোদন, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, ক্রীড়া এবং স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে গ্রীক সভ্যতার দান বলে শেষ করা সম্ভব নয়! বিশেষ করে, স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের উৎকর্ষ সাধনে সমসাময়িক সকল জাতি-গোষ্ঠীকে পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন গ্রীসের নগরবিদ ও স্থপতিরা, যা আজও আমাদের সমাজের বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলীতে পরিলক্ষিত হয়।

আমাদের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সকল স্থাপনা, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে রাজধানী শহরের হাইকোর্ট, পার্লামেন্ট হাউজ, কিংবা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, সবকিছুর নির্মাণশৈলীতে একটি বিষয়ে অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়, তা হচ্ছে – সবগুলো দালানেই বড় দানবাকৃতির কলাম বা পিলার ব্যবহার করা হয়। এই পিলারগুলো গ্রীক সভ্যতা বা স্থাপত্যশৈলী থেকে অনুপ্রাণিত। আর এসব পিলার স্থাপনাতেই তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। সেগুলো যথাক্রমে, ডরিক অর্ডার, আয়োনিক অর্ডার এবং করিন্থিয়ান অর্ডার। গ্রীক স্থাপত্যের এই তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়েই এই লেখাটি।

ডরিক অর্ডার বা ডরিক স্থাপত্য (খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০-৪৮০ -এর মাঝে বিকশিত): গ্রীক নির্মাণ শৈলী সম্পর্কে কথা বলতে গেলে প্রথমেই চলে আসে ডরিক অর্ডার বা ডরিক স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের কথা। এটি গ্রীক সভ্যতার প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সমূহে পরিলক্ষিত হতো। এ ধরণের পিলার নির্মাণ শৈলীতে মূলত কলামগুলো নিচের দিকে চওড়া হতো, কিন্তু কোনো বেইজ থাকতো না, একই সাথে কলামের ক্যাপিটাল হতো একদম ছিমছাম, ততো একটা কঠিন সাজসজ্জা ছিল না।

উল্লেখ্য, একটি কলাম বা পিলারের বেইজ বলা হয় নিচের দিকের মূল অংশকে এবং ক্যাপিটাল বলা হয় এর উপরের দিকে থাকা মূল অংশটিকে। প্রায় সবগুলো কলামের গায়েই লম্বালম্বিভাবে ডোরাকাটা দাগ কাটা থাকতো, এগুলোকে বলা হয় ফ্লুট।

লম্বা দালানের দৃষ্টিজনিত ভ্রম দূর করতে কিছু জ্যামিতিক সংশোধন করা হতো। যেমন কলাম বানানোর সময় উপর উঠাতে-উঠাতে সেটাকে কিছুটা ভেতরের দিকে ঠেলে উঠানো হতো, যাতে এটাকে দূর থেকে দেখলে গায়ের একদম সোজাসুজি উঠে যাওয়া ফ্লুটগুলোকে কিছুটা বাঁকা মনে হয়। একেবারে কোণার কলামগুলো কিছুটা মোটা করে বানানো হতো। এর চেয়ে সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো, প্রাচীন গ্রিসের এথেনিয়ান অ্যাক্রোপলিসের পার্থেনন মন্দির।

পরবর্তীতে রোমান সভ্যতাকালেও ডরিক স্থাপত্য নির্মাণ শৈলীর ব্যবহার দেখা যায়। তবে গ্রীক ডরিক কলামের সাথে রোমান ডরিক কলামের কিছু মৌলিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন: গ্রীক ডরিক কলামে বেইজ ছিলো না, কিন্তু রোমান ডরিক কলামে বেইজ ব্যবহৃত হতো। আবার, গ্রীক ডরিক কলাম নিচের দিকে চওড়া হতো, কিন্তু, রোমান ডরিক কলাম তুলনামূলক কম চওড়া ছিলো এবং দৈর্ঘ্যে গ্রীক কলামের চেয়ে লম্বা ছিলো। তবে, উভয় প্রকার কলামেই ডোরাকাটা দাগ পাওয়া যায়।

করিন্থের অ্যাপোলো মন্দির এবং নেমিয়ার জিউসের মন্দির – ডরিক কলামের অন্যতম বিখ্যাত উদাহরণ। বর্তমান সময়েও আমেরিকান রাজ্যগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভবনের বারান্দাসমূহে ডরিক কলাম বা পিলার ব্যবহারের বহুল প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশে ডরিক স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম উদাহরণ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ও শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) -তে অবস্থিত গ্রীক সমাধি সৌধ।

আয়োনিক অর্ডার বা আয়োনিক স্থাপত্য শৈলী (খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী হতে বিকশিত): ডরিক কলামের পরবর্তী উন্নত রূপ আয়োনিক অর্ডার বা আয়োনিক কলাম। ডরিক কলামের ক্যাপিটালগুলোতে যে অলঙ্করণের অভাব বা কারও কারুকার্যের অভাব ছিলো, সেটি পূর্ণতা পায় আয়োনিক কলামে এসে। এর মাথা বা ক্যাপিটালটা হতো একেবারে বুনো মহিষের শিংয়ের মতো দুই দিকে মোড়ানো (এটাকে ডবল স্ক্রল বা ভলিউট বলে)। আর, বেইজ ছিলো গোল সিঁড়ি আকৃতির কারুকার্য খচিত (স্ট্যাকড ডিস্ক)। ডরিক কলামের মতো আয়োনিক শৈলীতেও প্রায় সবগুলো কলামের গায়েই লম্বালম্বিভাবে ডোরাকাটা দাগ বা ফ্লুট কাটা থাকতো।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলেও দুদিকে হাতল বেষ্টিত যেসব মটকা বা মাটির পাত্র রয়েছে, সেগুলোতেও আয়োনিক স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া, বিশ্বজুড়েই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা ভবনেও আয়োনিক কলামের আবেদন আজও এতটুকুও ক্ষুন্ন হয়নি।

তুরস্কের সামোসে থাকা হেরা মন্দির (৫৬৫ খ্রিস্টপূর্ব) এবং ইফেসাসে আর্টেমিসের মন্দির (৩২৫ খ্রিস্টপূর্ব) আয়োনিক স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম বিখ্যাত উদাহরণ, যা আজও পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

করিন্থিয়ান অর্ডার বা করিন্থিয়ান স্থাপত্য (খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০-৩২৩ -এর মাঝে বিকশিত): গ্রীক সভ্যতায় ডরিক এবং আয়োনিক অর্ডারের পর কলামের সবচেয়ে উন্নত রূপ পরিলক্ষিত হয় করিন্থিয়ান অর্ডার বা করিন্থিয়ান স্থাপত্যে। এর সাথে রোমান কম্পোজিট পিলারগুলোর অনেক মিল পাওয়া যায়। করিন্থিয়ান কলামগুলো ছিল কিছুটা চিকন ও মোটামুটি লম্বা। এর বেইজ ছিল কারুকার্যমণ্ডিত। তবে প্রতিটি কলামে ফ্লুটের উপস্থিতি দৃশ্যমান। একই সাথে অনেক বেশি কারুকার্যমণ্ডিত ছিলো এর ক্যাপিটাল, যেখানে থাকতো ফুল ও পাতা আঁকা ছবি।

প্রাচীন গ্রীক মন্দির সমূহের অনেক কলামে করিন্থিয়ান অর্ডারের দর্শন পাওয়া যায়। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে এবং নিউইয়র্কে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বিল্ডিং, মার্কিন কংগ্রেস লাইব্রেরী বিল্ডিং, ইউ.এস. ক্যাপিটল এবং ন্যাশনাল আর্কাইভস বিল্ডিং, নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ বিল্ডিং সহ গুরুত্বপূর্ণ বহু স্থাপনায় করিন্থিয়ান স্থাপত্যশৈলীর পিলার বা কলাম পাওয়া যায়।

পরিশেষে, গ্রীক স্থাপত্য শৈলীর তিন বিশেষ বৈশিষ্ট্য, ডরিক, আয়োনিক এবং করিন্থিয়ান স্থাপত্যের যে বিশেষ অবদান এবং আবেদন পৃথিবীর ইতিহাসে পরিলক্ষিত হয়, তা অভূতপূর্ব। গ্রীক পরবর্তী বিশ্বের সকল সভ্যতাকালে স্থাপত্য শৈলীর উৎকর্ষ সাধনে এবং নতুন স্থাপত্য নির্মাণে পূর্বোক্ত তিন বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত কার্যকরভাবে মানব সমাজকে পথ দেখিয়েছে। তাই বলা যায়, যতদিন সুন্দর এবং সৌন্দর্য্যের কদর পৃথিবীতে থাকবে, ততোদিন গ্রীক সভ্যতার উক্ত তিন স্থাপত্যশৈলী পৃথিবীর বুকে অমর হয়ে থাকবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ট্যাগ:

এখনও প্রাসঙ্গিক গ্রীক স্থাপত্যের তিন ক্রম

প্রকাশ: ১২:০১:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই ২০২২

নওশীন নাওয়ার রাফা: মানব সভ্যতার বিকাশ ও ইতিহাসে গ্রীসের অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষা, সাহিত্য, ধর্ম, বিনোদন, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, ক্রীড়া এবং স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে গ্রীক সভ্যতার দান বলে শেষ করা সম্ভব নয়! বিশেষ করে, স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের উৎকর্ষ সাধনে সমসাময়িক সকল জাতি-গোষ্ঠীকে পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন গ্রীসের নগরবিদ ও স্থপতিরা, যা আজও আমাদের সমাজের বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলীতে পরিলক্ষিত হয়।

আমাদের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সকল স্থাপনা, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে রাজধানী শহরের হাইকোর্ট, পার্লামেন্ট হাউজ, কিংবা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, সবকিছুর নির্মাণশৈলীতে একটি বিষয়ে অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়, তা হচ্ছে – সবগুলো দালানেই বড় দানবাকৃতির কলাম বা পিলার ব্যবহার করা হয়। এই পিলারগুলো গ্রীক সভ্যতা বা স্থাপত্যশৈলী থেকে অনুপ্রাণিত। আর এসব পিলার স্থাপনাতেই তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। সেগুলো যথাক্রমে, ডরিক অর্ডার, আয়োনিক অর্ডার এবং করিন্থিয়ান অর্ডার। গ্রীক স্থাপত্যের এই তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়েই এই লেখাটি।

ডরিক অর্ডার বা ডরিক স্থাপত্য (খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০-৪৮০ -এর মাঝে বিকশিত): গ্রীক নির্মাণ শৈলী সম্পর্কে কথা বলতে গেলে প্রথমেই চলে আসে ডরিক অর্ডার বা ডরিক স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের কথা। এটি গ্রীক সভ্যতার প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সমূহে পরিলক্ষিত হতো। এ ধরণের পিলার নির্মাণ শৈলীতে মূলত কলামগুলো নিচের দিকে চওড়া হতো, কিন্তু কোনো বেইজ থাকতো না, একই সাথে কলামের ক্যাপিটাল হতো একদম ছিমছাম, ততো একটা কঠিন সাজসজ্জা ছিল না।

উল্লেখ্য, একটি কলাম বা পিলারের বেইজ বলা হয় নিচের দিকের মূল অংশকে এবং ক্যাপিটাল বলা হয় এর উপরের দিকে থাকা মূল অংশটিকে। প্রায় সবগুলো কলামের গায়েই লম্বালম্বিভাবে ডোরাকাটা দাগ কাটা থাকতো, এগুলোকে বলা হয় ফ্লুট।

লম্বা দালানের দৃষ্টিজনিত ভ্রম দূর করতে কিছু জ্যামিতিক সংশোধন করা হতো। যেমন কলাম বানানোর সময় উপর উঠাতে-উঠাতে সেটাকে কিছুটা ভেতরের দিকে ঠেলে উঠানো হতো, যাতে এটাকে দূর থেকে দেখলে গায়ের একদম সোজাসুজি উঠে যাওয়া ফ্লুটগুলোকে কিছুটা বাঁকা মনে হয়। একেবারে কোণার কলামগুলো কিছুটা মোটা করে বানানো হতো। এর চেয়ে সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো, প্রাচীন গ্রিসের এথেনিয়ান অ্যাক্রোপলিসের পার্থেনন মন্দির।

পরবর্তীতে রোমান সভ্যতাকালেও ডরিক স্থাপত্য নির্মাণ শৈলীর ব্যবহার দেখা যায়। তবে গ্রীক ডরিক কলামের সাথে রোমান ডরিক কলামের কিছু মৌলিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন: গ্রীক ডরিক কলামে বেইজ ছিলো না, কিন্তু রোমান ডরিক কলামে বেইজ ব্যবহৃত হতো। আবার, গ্রীক ডরিক কলাম নিচের দিকে চওড়া হতো, কিন্তু, রোমান ডরিক কলাম তুলনামূলক কম চওড়া ছিলো এবং দৈর্ঘ্যে গ্রীক কলামের চেয়ে লম্বা ছিলো। তবে, উভয় প্রকার কলামেই ডোরাকাটা দাগ পাওয়া যায়।

করিন্থের অ্যাপোলো মন্দির এবং নেমিয়ার জিউসের মন্দির – ডরিক কলামের অন্যতম বিখ্যাত উদাহরণ। বর্তমান সময়েও আমেরিকান রাজ্যগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভবনের বারান্দাসমূহে ডরিক কলাম বা পিলার ব্যবহারের বহুল প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশে ডরিক স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম উদাহরণ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ও শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) -তে অবস্থিত গ্রীক সমাধি সৌধ।

আয়োনিক অর্ডার বা আয়োনিক স্থাপত্য শৈলী (খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী হতে বিকশিত): ডরিক কলামের পরবর্তী উন্নত রূপ আয়োনিক অর্ডার বা আয়োনিক কলাম। ডরিক কলামের ক্যাপিটালগুলোতে যে অলঙ্করণের অভাব বা কারও কারুকার্যের অভাব ছিলো, সেটি পূর্ণতা পায় আয়োনিক কলামে এসে। এর মাথা বা ক্যাপিটালটা হতো একেবারে বুনো মহিষের শিংয়ের মতো দুই দিকে মোড়ানো (এটাকে ডবল স্ক্রল বা ভলিউট বলে)। আর, বেইজ ছিলো গোল সিঁড়ি আকৃতির কারুকার্য খচিত (স্ট্যাকড ডিস্ক)। ডরিক কলামের মতো আয়োনিক শৈলীতেও প্রায় সবগুলো কলামের গায়েই লম্বালম্বিভাবে ডোরাকাটা দাগ বা ফ্লুট কাটা থাকতো।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলেও দুদিকে হাতল বেষ্টিত যেসব মটকা বা মাটির পাত্র রয়েছে, সেগুলোতেও আয়োনিক স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া, বিশ্বজুড়েই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা ভবনেও আয়োনিক কলামের আবেদন আজও এতটুকুও ক্ষুন্ন হয়নি।

তুরস্কের সামোসে থাকা হেরা মন্দির (৫৬৫ খ্রিস্টপূর্ব) এবং ইফেসাসে আর্টেমিসের মন্দির (৩২৫ খ্রিস্টপূর্ব) আয়োনিক স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম বিখ্যাত উদাহরণ, যা আজও পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

করিন্থিয়ান অর্ডার বা করিন্থিয়ান স্থাপত্য (খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০-৩২৩ -এর মাঝে বিকশিত): গ্রীক সভ্যতায় ডরিক এবং আয়োনিক অর্ডারের পর কলামের সবচেয়ে উন্নত রূপ পরিলক্ষিত হয় করিন্থিয়ান অর্ডার বা করিন্থিয়ান স্থাপত্যে। এর সাথে রোমান কম্পোজিট পিলারগুলোর অনেক মিল পাওয়া যায়। করিন্থিয়ান কলামগুলো ছিল কিছুটা চিকন ও মোটামুটি লম্বা। এর বেইজ ছিল কারুকার্যমণ্ডিত। তবে প্রতিটি কলামে ফ্লুটের উপস্থিতি দৃশ্যমান। একই সাথে অনেক বেশি কারুকার্যমণ্ডিত ছিলো এর ক্যাপিটাল, যেখানে থাকতো ফুল ও পাতা আঁকা ছবি।

প্রাচীন গ্রীক মন্দির সমূহের অনেক কলামে করিন্থিয়ান অর্ডারের দর্শন পাওয়া যায়। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে এবং নিউইয়র্কে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বিল্ডিং, মার্কিন কংগ্রেস লাইব্রেরী বিল্ডিং, ইউ.এস. ক্যাপিটল এবং ন্যাশনাল আর্কাইভস বিল্ডিং, নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ বিল্ডিং সহ গুরুত্বপূর্ণ বহু স্থাপনায় করিন্থিয়ান স্থাপত্যশৈলীর পিলার বা কলাম পাওয়া যায়।

পরিশেষে, গ্রীক স্থাপত্য শৈলীর তিন বিশেষ বৈশিষ্ট্য, ডরিক, আয়োনিক এবং করিন্থিয়ান স্থাপত্যের যে বিশেষ অবদান এবং আবেদন পৃথিবীর ইতিহাসে পরিলক্ষিত হয়, তা অভূতপূর্ব। গ্রীক পরবর্তী বিশ্বের সকল সভ্যতাকালে স্থাপত্য শৈলীর উৎকর্ষ সাধনে এবং নতুন স্থাপত্য নির্মাণে পূর্বোক্ত তিন বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত কার্যকরভাবে মানব সমাজকে পথ দেখিয়েছে। তাই বলা যায়, যতদিন সুন্দর এবং সৌন্দর্য্যের কদর পৃথিবীতে থাকবে, ততোদিন গ্রীক সভ্যতার উক্ত তিন স্থাপত্যশৈলী পৃথিবীর বুকে অমর হয়ে থাকবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়