১০:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

স্মার্ট উপজেলা নির্মাণে আওয়ামী-লীগকে আট দফা প্রস্তাব

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার প্রণয়নে জনগণের মতামত চেয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গত ০৩ অক্টোবর এক গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যুক্ত করার জন্য নাগরিকদের কাছ থেকে মতামত বা প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। গণমাধ্যমের খবর বলছে, এবার তৃণমূলের প্রত্যাশা জেনে ইশতেহার দিতে চায় আওয়ামী লীগ। সেজন্য ছাত্র, কৃষক, স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষসহ সমাজের নিম্নআয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের প্রত্যাশা জানাতে দলের উপজেলা কমিটিগুলোকে চিঠি দিয়েছে আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রণয়ন উপকমিটি। এ বিষয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে তারা কাজ শুরু করেছে। নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নে এবার দলটির স্লোগান ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঘোষিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারের স্লোগান ছিল ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩১ অক্টোবর ‘স্মার্ট উপজেলা’ বিনির্মাণে আট দফা প্রস্তাবনা সংযুক্ত করে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন উপ-কমিটির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন উন্নয়নধর্মী প্রতিষ্ঠান ‘সঞ্জীবন যুব সংস্থা’র কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্কের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও পলিসি এনালিস্ট ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল।

ইশতেহার প্রণয়ন উপ-কমিটির কাছে পাঠানো প্রস্তাবনার প্রথম দফায় তরুণ এই সংগঠক শিক্ষা খাতে সংস্কারের উল্লেখ পূর্বক দুটো উপ-দফা যুক্ত করেছেন। সেগুলো যথাক্রমে, ক। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শ ও গরীমা ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতি উপজেলায় প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে পরিবর্তন করা হবে; প্রতিটি স্কুলে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার ও বিজ্ঞান চেয়ার স্থাপন করা হবে। এবং, খ। প্রাক-প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি নির্ভর, দক্ষতা ভিত্তিক ও মানবিক মূল্যবোধ-সম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা কার্যকরে পদক্ষেপ নেয়া হবে। গ্রামের প্রতিটি স্কুলে সায়েন্স ক্লাব গঠন।

দ্বিতীয় দফায় তিনি কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ খাতে সংস্কার বিষয়ে তিনটি উপদফা সংযুক্ত করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ক। শিক্ষিত বেকারদের ইউনিয়ন ও গ্রামভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন পূর্বক যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজন উপার্জন ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি নিশ্চিত করা হবে। খ। দেশের প্রতিটি উপজেলায় বিভিন্ন খাতে নেতৃত্ব প্রদানকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট উপজেলার প্রবাসীদের পুঙ্খানুপুঙ্খ তালিকা তৈরী পূর্বক তাঁদের জন্য উপযুক্ত বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে এবং অকৃষিজ জমিতে শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর (বিশেষত নারী ও প্রতিবন্ধী) কর্মসংস্থান করা হবে। এবং, গ। প্রতি ইউনিয়নে স্মার্ট সেন্টার নির্মাণের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং ও প্রযুক্তিতে আগ্রহী ও দক্ষ তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এছাড়া, প্রতি ইউনিয়নে একটি ক্ষুদ্র পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল তৈরী করা হবে।

তৃতীয় দফার পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের কথা বলেছেন তিনি। এই স্তরে উল্লেখ করা তিনটি উপ-দফা যথাক্রমে, ক। গ্রামীণ কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহে অভিজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত করা হবে। খ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে প্রযুক্তি নির্ভর ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে। এবং, গ। চিকিৎসা ও চিকিৎসকের পরামর্শ প্রাপ্তি তরান্বিত করতে সরকারী অর্থায়নে ‘স্মার্ট হেলথ অ্যাপ’ তৈরী করা হবে।

প্রস্তাবনার চতুর্থ দফায় যোগাযোগ খাতে সংস্কারে ছয়টি উপ-দফা সংযুক্ত করেছেন ফাহিম। সেগুলো যথাক্রমে, ক। উপজেলার অসমাপ্ত সকল সড়ক ও মহাসড়কের কাজ সম্পন্ন করা হবে। খ। প্রতিটি গ্রামের সকল সড়কের তালিকা পূর্বক প্রয়োজনীয় সংস্কার, নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। গ। উপজেলার সকল ইউনিয়ন ও পৌরসভার মাঝে সহজলভ্য আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুগোপযোগী ও স্মার্ট পরিবহণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে, যেমন: পরিবেশবান্ধব চক্রাকার আন্তঃ ইউনিয়ন রাইড শেয়ারিং সার্ভিস সহ প্রভৃতি। এতে উপজেলার পর্যটন শিল্প বিকশিত করার সম্ভাবনা তৈরী হবে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। ঘ। ঢাকা সহ সারা দেশের সাথে যোগাযোগ সহজীকরণের লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলার ভিন্ন দুটো প্রান্তে অন্তত দুটো বিকল্প সড়ক ব্যবস্থা তৈরী এবং নৌপথ পুনর্গঠনে কাজ করা হবে। ঙ। উপজেলার এক ইউনিয়ন হতে অন্য ইউনিয়নে বাজার বিনিময় তথা বাণিজ্য বিনিময় নিশ্চিত করা হবে। এবং, চ। উপজেলার প্রধান সড়ক জুড়ে, বিশেষ করে পৌর এলাকায় দিনের বেলা ট্রাক চলাচল নিষিদ্ধ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় পার্কিং লট নিশ্চিত করা হবে।

পঞ্চম দফায় কৃষি খাতে সংস্কার ইস্যুতে কথা বলেছেন এই সংগঠক। এ পর্যায়ে দুটো উপদফা যুক্ত করেছেন তিনি। সেগুলো যথাক্রমে, ক। গ্রাম ও ইউনিয়ন ভিত্তিক ধান, মৎস্য ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের সুষ্ঠু বাজারজাতকরণে এবং সঠিক ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকল্পে তদারকির স্বার্থে ‘স্মার্ট কৃষি’ সেল স্থাপন। এবং, খ। উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কৃষিজ পণ্যসমূহ এবং জিআই পণ্যসমূহকে (যেমন: পাঙ্গাস, লাল চিনি ইত্যাদি) সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানীর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

ষষ্ঠ দফার প্রস্তাবনায় পরিবেশ অধিকার সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে লিখেছেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ। এ পর্যায়ে উল্লেখ করা পাঁচ দফায় তিনি লিখেছেন, ক। উপজেলার বুক চিড়ে বয়ে চলা প্রতিটি নদ-নদী ও খাল এর নাব্যতা নিশ্চিতকরণ, দখলমুক্ত করণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা হাতে নেয়া। খ। দূষণ কমাতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে প্রতি উপজেলায় কৃত্রিম উদ্যোগে ক্ষুদ্র বা মাঝারী বন/বনাঞ্চল স্থাপন। গ। বনের পশুদের রক্ষায় উপযুক্ত ব্যবস্থাদি নিশ্চিত করা। ঘ। উপযুক্ত স্মার্ট ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এবং, ঙ। গ্রীন বিল্ডিং নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজনীয় প্রচার ও পদক্ষেপ গ্রহণ। (যেমন: যাদের বাসায় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ছাদকৃষি থাকবে, কিংবা গ্রীন বিল্ডিং নিশ্চিত করা হবে, তাদেরকে ১০-২০% করমুক্ত ঘোষণা করা হবে।)

চিঠিতে দেয়া প্রস্তাবনার সপ্তম পর্যায়ে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় তারুণ্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকল্পে পাঁচটি উপদফা অন্তর্ভূক্ত করেছেন এই সংগঠক। তিনি লিখেছেন, ক। মাদক, জুয়া ও সন্ত্রাসমুক্ত উপজেলা বিনির্মাণে প্রয়োজনীয় পুলিশ ফাঁড়ি বিনির্মাণ এবং নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন। খ। উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তে ও মোড়ে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে ‘মাদকমুক্ত কর্ণার’ প্রতিষ্ঠা করা। গ। খেলার মাঠ স্থাপন ও দখলমুক্ত করণে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ। ঘ। তরুণদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেমন: গ্রাম লাইব্রেরী, সাংস্কৃতিক ক্লাব কিংবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহকে যথাযথ স্বীকৃতি, দিকনির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান এবং সঠিক মূল্যায়নের জন্য আলাদা টীম স্থাপন। এবং, ঙ। তরুণদের নিত্য-নতুন উদ্ভাবনী ও স্মার্ট আইডিয়াসমূহ জানতে ও মূল ধারায় তা পরিচিত করাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।

অষ্টম তথা সর্বশেষ প্রস্তাবনায় বিবিধ শিরোনামে আরও পাঁচটি উপদফা অন্তর্ভূক্ত করেছেন তরুণ এই সাংবাদিক। তিনি লিখেছেন, ক। প্রতিটি ওয়ার্ডে উপযুক্ত কমিউনিটি পরিষেবা নিশ্চিতকল্পে ওয়ার্ড মেম্বার বা কমিশনারকে বাইরে রেখে ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হবে। যার মাঝে তিনজন তরুণ (অনুর্ধ্ব ৩০ বছর বয়সী, ন্যূনতম স্নাতক পাশ) এবং তিনজন প্রবীণ (অনুর্ধ্ব ৬০ বছর বয়সী, সমাজের সম্মানীয়) এবং বাধ্যতামূলকভাবে একজন নারী সদস্য থাকবেন। তারা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সকল প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি তদারকি করবেন এবং সংশ্লিষ্ট এমপি বরাবর তাঁদের চাওয়া পেশ করবেন। খ। উপজেলার গুণী সন্তানদের স্মরণ, উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং তা প্রচারকল্পে উপজেলা পরিষদে স্মার্ট জাদুঘর স্থাপন এবং প্রতিবছর স্মার্ট মেলা আয়োজন। গ। তরুণ প্রজন্মকে গণমুখী কাজে জড়িত করতে উপজেলায় কাজ করা স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে ছায়া সংসদের আদলে একটি সিনেট তৈরী। ঘ। সার্বক্ষণিক জবাবদিহি ও জনসাধারণের সার্বিক সমস্যাদি শুনতে এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে ২৪*৭ ভিত্তিতে ‘কল মাই এমপি’ পরিষেবা চালু করা হবে। এবং, ঙ। নির্বাচনকালীন সময়ে যত্রতত্র পোস্টার, ব্যানারের বদলে উন্নত ডাস্টবিন এবং ছাউনী তৈরী করে দেয়া হবে। তাতে সৌজন্যে- প্রার্থীর নাম লিখা থাকবে।

আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন উপ-কমিটির কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো সম্পর্কে ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল জানান, “নগর গবেষণা, সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি এবং তৃণমূল স্তরের সংগঠনে কাজ করার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা, এই তিনের সমন্বয়ে আট দফা প্রস্তাবনা তৈরী করেছি। নিজ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বরাবরই তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে দেশের উন্নয়ন বাস্তবায়নে কাজ করেছে। তাই, আওয়ামী লীগের সুদক্ষ ও বিজ্ঞ নির্বাচনী ইশতেহার উপ-কমিটির কাছে আমার প্রস্তাবনাসমূহ লিখিতভাবে পাঠিয়েছি। আশা করি, আপামর জনতার আওয়াজ গ্রহণে ও সৃজনশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক তরুণদের এই ক্যাম্পেইনে যুক্ত করতে তারা আমার প্রস্তাবনাসমূহ বিবেচনা করবেন।”

ট্যাগ:

স্মার্ট উপজেলা নির্মাণে আওয়ামী-লীগকে আট দফা প্রস্তাব

প্রকাশ: ০৯:৫৩:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ নভেম্বর ২০২৩

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার প্রণয়নে জনগণের মতামত চেয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গত ০৩ অক্টোবর এক গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যুক্ত করার জন্য নাগরিকদের কাছ থেকে মতামত বা প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। গণমাধ্যমের খবর বলছে, এবার তৃণমূলের প্রত্যাশা জেনে ইশতেহার দিতে চায় আওয়ামী লীগ। সেজন্য ছাত্র, কৃষক, স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষসহ সমাজের নিম্নআয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের প্রত্যাশা জানাতে দলের উপজেলা কমিটিগুলোকে চিঠি দিয়েছে আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রণয়ন উপকমিটি। এ বিষয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে তারা কাজ শুরু করেছে। নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নে এবার দলটির স্লোগান ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঘোষিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারের স্লোগান ছিল ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩১ অক্টোবর ‘স্মার্ট উপজেলা’ বিনির্মাণে আট দফা প্রস্তাবনা সংযুক্ত করে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন উপ-কমিটির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন উন্নয়নধর্মী প্রতিষ্ঠান ‘সঞ্জীবন যুব সংস্থা’র কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্কের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও পলিসি এনালিস্ট ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল।

ইশতেহার প্রণয়ন উপ-কমিটির কাছে পাঠানো প্রস্তাবনার প্রথম দফায় তরুণ এই সংগঠক শিক্ষা খাতে সংস্কারের উল্লেখ পূর্বক দুটো উপ-দফা যুক্ত করেছেন। সেগুলো যথাক্রমে, ক। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শ ও গরীমা ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতি উপজেলায় প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে পরিবর্তন করা হবে; প্রতিটি স্কুলে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার ও বিজ্ঞান চেয়ার স্থাপন করা হবে। এবং, খ। প্রাক-প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি নির্ভর, দক্ষতা ভিত্তিক ও মানবিক মূল্যবোধ-সম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা কার্যকরে পদক্ষেপ নেয়া হবে। গ্রামের প্রতিটি স্কুলে সায়েন্স ক্লাব গঠন।

দ্বিতীয় দফায় তিনি কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ খাতে সংস্কার বিষয়ে তিনটি উপদফা সংযুক্ত করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ক। শিক্ষিত বেকারদের ইউনিয়ন ও গ্রামভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন পূর্বক যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজন উপার্জন ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি নিশ্চিত করা হবে। খ। দেশের প্রতিটি উপজেলায় বিভিন্ন খাতে নেতৃত্ব প্রদানকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট উপজেলার প্রবাসীদের পুঙ্খানুপুঙ্খ তালিকা তৈরী পূর্বক তাঁদের জন্য উপযুক্ত বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে এবং অকৃষিজ জমিতে শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর (বিশেষত নারী ও প্রতিবন্ধী) কর্মসংস্থান করা হবে। এবং, গ। প্রতি ইউনিয়নে স্মার্ট সেন্টার নির্মাণের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং ও প্রযুক্তিতে আগ্রহী ও দক্ষ তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এছাড়া, প্রতি ইউনিয়নে একটি ক্ষুদ্র পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল তৈরী করা হবে।

তৃতীয় দফার পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের কথা বলেছেন তিনি। এই স্তরে উল্লেখ করা তিনটি উপ-দফা যথাক্রমে, ক। গ্রামীণ কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহে অভিজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত করা হবে। খ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে প্রযুক্তি নির্ভর ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে। এবং, গ। চিকিৎসা ও চিকিৎসকের পরামর্শ প্রাপ্তি তরান্বিত করতে সরকারী অর্থায়নে ‘স্মার্ট হেলথ অ্যাপ’ তৈরী করা হবে।

প্রস্তাবনার চতুর্থ দফায় যোগাযোগ খাতে সংস্কারে ছয়টি উপ-দফা সংযুক্ত করেছেন ফাহিম। সেগুলো যথাক্রমে, ক। উপজেলার অসমাপ্ত সকল সড়ক ও মহাসড়কের কাজ সম্পন্ন করা হবে। খ। প্রতিটি গ্রামের সকল সড়কের তালিকা পূর্বক প্রয়োজনীয় সংস্কার, নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। গ। উপজেলার সকল ইউনিয়ন ও পৌরসভার মাঝে সহজলভ্য আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুগোপযোগী ও স্মার্ট পরিবহণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে, যেমন: পরিবেশবান্ধব চক্রাকার আন্তঃ ইউনিয়ন রাইড শেয়ারিং সার্ভিস সহ প্রভৃতি। এতে উপজেলার পর্যটন শিল্প বিকশিত করার সম্ভাবনা তৈরী হবে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। ঘ। ঢাকা সহ সারা দেশের সাথে যোগাযোগ সহজীকরণের লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলার ভিন্ন দুটো প্রান্তে অন্তত দুটো বিকল্প সড়ক ব্যবস্থা তৈরী এবং নৌপথ পুনর্গঠনে কাজ করা হবে। ঙ। উপজেলার এক ইউনিয়ন হতে অন্য ইউনিয়নে বাজার বিনিময় তথা বাণিজ্য বিনিময় নিশ্চিত করা হবে। এবং, চ। উপজেলার প্রধান সড়ক জুড়ে, বিশেষ করে পৌর এলাকায় দিনের বেলা ট্রাক চলাচল নিষিদ্ধ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় পার্কিং লট নিশ্চিত করা হবে।

পঞ্চম দফায় কৃষি খাতে সংস্কার ইস্যুতে কথা বলেছেন এই সংগঠক। এ পর্যায়ে দুটো উপদফা যুক্ত করেছেন তিনি। সেগুলো যথাক্রমে, ক। গ্রাম ও ইউনিয়ন ভিত্তিক ধান, মৎস্য ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের সুষ্ঠু বাজারজাতকরণে এবং সঠিক ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকল্পে তদারকির স্বার্থে ‘স্মার্ট কৃষি’ সেল স্থাপন। এবং, খ। উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কৃষিজ পণ্যসমূহ এবং জিআই পণ্যসমূহকে (যেমন: পাঙ্গাস, লাল চিনি ইত্যাদি) সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানীর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

ষষ্ঠ দফার প্রস্তাবনায় পরিবেশ অধিকার সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে লিখেছেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ। এ পর্যায়ে উল্লেখ করা পাঁচ দফায় তিনি লিখেছেন, ক। উপজেলার বুক চিড়ে বয়ে চলা প্রতিটি নদ-নদী ও খাল এর নাব্যতা নিশ্চিতকরণ, দখলমুক্ত করণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা হাতে নেয়া। খ। দূষণ কমাতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে প্রতি উপজেলায় কৃত্রিম উদ্যোগে ক্ষুদ্র বা মাঝারী বন/বনাঞ্চল স্থাপন। গ। বনের পশুদের রক্ষায় উপযুক্ত ব্যবস্থাদি নিশ্চিত করা। ঘ। উপযুক্ত স্মার্ট ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এবং, ঙ। গ্রীন বিল্ডিং নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজনীয় প্রচার ও পদক্ষেপ গ্রহণ। (যেমন: যাদের বাসায় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ছাদকৃষি থাকবে, কিংবা গ্রীন বিল্ডিং নিশ্চিত করা হবে, তাদেরকে ১০-২০% করমুক্ত ঘোষণা করা হবে।)

চিঠিতে দেয়া প্রস্তাবনার সপ্তম পর্যায়ে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় তারুণ্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকল্পে পাঁচটি উপদফা অন্তর্ভূক্ত করেছেন এই সংগঠক। তিনি লিখেছেন, ক। মাদক, জুয়া ও সন্ত্রাসমুক্ত উপজেলা বিনির্মাণে প্রয়োজনীয় পুলিশ ফাঁড়ি বিনির্মাণ এবং নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন। খ। উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তে ও মোড়ে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে ‘মাদকমুক্ত কর্ণার’ প্রতিষ্ঠা করা। গ। খেলার মাঠ স্থাপন ও দখলমুক্ত করণে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ। ঘ। তরুণদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেমন: গ্রাম লাইব্রেরী, সাংস্কৃতিক ক্লাব কিংবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহকে যথাযথ স্বীকৃতি, দিকনির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান এবং সঠিক মূল্যায়নের জন্য আলাদা টীম স্থাপন। এবং, ঙ। তরুণদের নিত্য-নতুন উদ্ভাবনী ও স্মার্ট আইডিয়াসমূহ জানতে ও মূল ধারায় তা পরিচিত করাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।

অষ্টম তথা সর্বশেষ প্রস্তাবনায় বিবিধ শিরোনামে আরও পাঁচটি উপদফা অন্তর্ভূক্ত করেছেন তরুণ এই সাংবাদিক। তিনি লিখেছেন, ক। প্রতিটি ওয়ার্ডে উপযুক্ত কমিউনিটি পরিষেবা নিশ্চিতকল্পে ওয়ার্ড মেম্বার বা কমিশনারকে বাইরে রেখে ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হবে। যার মাঝে তিনজন তরুণ (অনুর্ধ্ব ৩০ বছর বয়সী, ন্যূনতম স্নাতক পাশ) এবং তিনজন প্রবীণ (অনুর্ধ্ব ৬০ বছর বয়সী, সমাজের সম্মানীয়) এবং বাধ্যতামূলকভাবে একজন নারী সদস্য থাকবেন। তারা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সকল প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি তদারকি করবেন এবং সংশ্লিষ্ট এমপি বরাবর তাঁদের চাওয়া পেশ করবেন। খ। উপজেলার গুণী সন্তানদের স্মরণ, উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং তা প্রচারকল্পে উপজেলা পরিষদে স্মার্ট জাদুঘর স্থাপন এবং প্রতিবছর স্মার্ট মেলা আয়োজন। গ। তরুণ প্রজন্মকে গণমুখী কাজে জড়িত করতে উপজেলায় কাজ করা স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে ছায়া সংসদের আদলে একটি সিনেট তৈরী। ঘ। সার্বক্ষণিক জবাবদিহি ও জনসাধারণের সার্বিক সমস্যাদি শুনতে এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে ২৪*৭ ভিত্তিতে ‘কল মাই এমপি’ পরিষেবা চালু করা হবে। এবং, ঙ। নির্বাচনকালীন সময়ে যত্রতত্র পোস্টার, ব্যানারের বদলে উন্নত ডাস্টবিন এবং ছাউনী তৈরী করে দেয়া হবে। তাতে সৌজন্যে- প্রার্থীর নাম লিখা থাকবে।

আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন উপ-কমিটির কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো সম্পর্কে ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল জানান, “নগর গবেষণা, সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি এবং তৃণমূল স্তরের সংগঠনে কাজ করার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা, এই তিনের সমন্বয়ে আট দফা প্রস্তাবনা তৈরী করেছি। নিজ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বরাবরই তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে দেশের উন্নয়ন বাস্তবায়নে কাজ করেছে। তাই, আওয়ামী লীগের সুদক্ষ ও বিজ্ঞ নির্বাচনী ইশতেহার উপ-কমিটির কাছে আমার প্রস্তাবনাসমূহ লিখিতভাবে পাঠিয়েছি। আশা করি, আপামর জনতার আওয়াজ গ্রহণে ও সৃজনশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক তরুণদের এই ক্যাম্পেইনে যুক্ত করতে তারা আমার প্রস্তাবনাসমূহ বিবেচনা করবেন।”