০৩:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

কার্বন মুক্ত শহর গড়তে আমাদের করণীয়

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল:

বিশ্বজুড়ে দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে গড় তাপমাত্রার পরিমাণ। দৃশ্যমান হয়ে উঠছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব। নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দূর্ঘটনায় বিপন্ন হয়ে ইতোমধ্যে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়েছে সহস্রাধিক প্রজাতির পশুপাখি। গোটা মানবজাতির জন্য সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। ইতোপূর্বে মুখোমুখি হওয়া কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগই মানবজাতিকে এতো ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন করেনি। অথচ ত্রাস ছড়ানো এই বিপদের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে গুটিকয়েক প্রাকৃতিক গ্যাস! প্রকৃতিতে নাগিনীর বিষাক্ত নিশ্বাস ছাড়ছে গ্যাস গুলোর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। বিপদসংকুল পৃথিবী এখন অস্তিত্ব সংকটে। এমতাবস্থায়, যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে আনা না হয়, তবে ক্রমাগত বেড়েই চলবে জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল। আর এই দুর্যোগ মোকাবিলার জন্যেই অপরিহার্য কার্বন মুক্ত শহর তৈরী।

কার্বন মুক্ত শহর কী? কার্বন মুক্ত শহর বলতে সাধারণত এমন কোনো শহরকে বুঝায়, যেখানে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ থাকবে শুন্যের কোটায়। বাস্তবিক অর্থে, কোনো অঞ্চল বা শহর যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন করে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কার্বন শোষণক্ষম হতে পারলেই, সেই শহর বা অঞ্চলকে কার্বনমুক্ত হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। যেমন: সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাসদার সিটি এবং চীনের ডংটান শহর। উক্ত দুটো শহরই কার্বন নিঃসরণ ও শোষণের দৃশ্যমান পার্থক্য তৈরী পূর্বক কার্বনমুক্ত শহর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

কার্বন মুক্ত শহর তৈরীর প্রয়োজনীয়তা ও প্রেক্ষাপট: সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণা রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে, শিল্প বিপ্লবের পর মানুষ বায়ুমণ্ডলে দুই হাজার গিগাটনের বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত করেছে। তাপ শোষণকারী গ্রিনহাউজ গ্যাস বায়ুমণ্ডলে যে আবরণ তৈরি করেছে, তার ফল হিসেবে আমরা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্মুখীন হয়েছি।

বায়ুমণ্ডলে আমরা যত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করি, তার অর্ধেকটা শুধু সেখানে থাকে, বাকিটা সমুদ্র ও জীবমণ্ডলে পুনঃ সঞ্চালিত হয়। কিন্তু সমুদ্র যত দ্রুত অভিসিঞ্চিত হচ্ছে এবং যত তার শোষণক্ষমতা কমছে, ততই এই পুনঃ সঞ্চালনের হার কমছে। একইভাবে তাপমাত্রা বাড়লে মাটির কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের হারও বাড়ে, এতে পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বাড়ে।

যদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এই গতি কমিয়ে আনা না হয়, গ্রিন হাউস গ্যাসের দ্রুত নির্গমন রোধ না করা হয়, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল, যেমন দাবানল, তাপপ্রবাহ, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা ইত্যাদির প্রভাব বেড়েই চলবে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসকরণের যোগসূত্র এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর তাই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জরুরী আহবান- কার্বন নিঃসরণ কমানো তথা কার্বন মুক্ত শহর তৈরী।

কার্বন নিঃসরণ এবং পরিবেশে এর প্রভাব: পেট্রোল, ডিজেল, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাসসহ প্রায় সকল জীবাশ্ম জ্বালানিতেই কার্বন বিদ্যমান এবং তা পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন করলে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়। ক্ষুদ্রার্থে, এটিই কার্বন নিঃসরণ। এর ফলে পরিবেশ ও জনজীবন মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে।

কার্বন এর মাত্রাধিক্যতা, বিশাল নির্গমন- আমাদের শহরগুলোকে অনেক বেশি অনিরাপদ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে গড়ে তুলেছে। শুধুমাত্র চীন এবং আমেরিকা মিলেই প্রায় ৫০% এর কাছাকাছি কার্বন নির্গমন করছে। পরিবেশের এই মারাত্মক দূষণের ফলে প্রতি বছর মারা যাচ্ছে লাখো মানুষ। নিধন হচ্ছে সবুজ বৃক্ষ। বেড়ে চলেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

খোদ জাতিসংঘের তথ্যমতে, শুধুমাত্র অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের জন্য ২০১২ সালে বিশ্বে ১২.৬ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিলো। জাতিসংঘের অন্য আরেকটি প্রতিবেদন মতে, বিশ্বে প্রতি ১০ টি শহরের মাঝে ১ টিরও কম শহর স্বাস্থ্যকর জলবায়ু নিশ্চায়নে কাজ করে!

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫-২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম রাখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব রোধ করার জন্য এটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু, আমাদের শুধু কার্বন নিঃসরণ কমালেই হবে না, বরং বায়ুমণ্ডল থেকে কিছু কার্বন অপসারণ করে তা সংরক্ষণও করতে হবে।

কার্বন নিঃসরণের বাস্তবিক চিত্র: বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন সমূহ কিংবা বিশ্ব মোড়লদের হাঁকডাক সত্ত্বেও বিশ্বে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা হতাশার উদ্রেক ঘটায়। বিশ্বের বেশির ভাগ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের জন্য দায়ী মাত্র চারটি দেশ (চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ভারত) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি সীমিত রাখার লক্ষ্যে নির্গমন কমাতে এই চার দেশ ও ইইউ ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। কিন্তু তারপরও তেমন কোনো বড় পদক্ষেপ নেয়নি তাঁরা।

চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনকারী দেশ। বৈশ্বিক নির্গমনের এক-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী চীন। বিশেষ করে কয়লা নির্ভরতার কারণে দেশটির কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন এখনো বাড়ছে। চীনের মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ ৮ দশমিক ১ টন।

চীন ২০২৬ সাল থেকে কয়লার ব্যবহার কমানোর অঙ্গীকার করেছে। বিদেশে নতুন কয়লা ভিত্তিক প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করবে বলে গত মাসে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। চীনা প্রেসিডেন্টের এমন ঘোষণা সত্ত্বেও দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে কয়লাখনি গুলোকে উৎপাদন বাড়াতে বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলছে, চীনকে তার জলবায়ু সংক্রান্ত লক্ষ্য অর্জনে ২০৬০ সালের মধ্যে কয়লার চাহিদা ৮০ শতাংশের বেশি কমাতে হবে। অপর গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেনের নির্গমন ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ কমানোর ব্যাপারে চলমান জলবায়ু সম্মেলনে অঙ্গীকার করেছে শতাধিক দেশ। কিন্তু এই দেশগুলোর মধ্যে চীন নেই।

নজরদারি সংস্থা ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার’ বলছে, চীনের নীতি ও পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। সব দেশ যদি একই পথ অনুসরণ করে, তাহলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। চীন ২০৬০ সালের মধ্য ‘কার্বন ডাই-অক্সাইড–নিরপেক্ষ’ হওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

অন্যদিকে, বিশ্বে মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের দিক দিয়ে সবার ওপরে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ ১৫ দশমিক ৫ টন। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির ৮০ শতাংশের বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সবুজ জ্বালানির আওতা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে গত এক দশকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমছে। তবে ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য অনুযায়ী বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে দেশটির বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যুক্তরাষ্ট্র ২০৫০ সালের মধ্যে ‘কার্বন ডাই-অক্সাইড-নিরপেক্ষ’ হওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

এছাড়া, ইইউতে সবচেয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনকারী দেশগুলো হলো জার্মানি, ইতালি ও পোল্যান্ড। ইইউতে মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ ৬ দশমিক ৫ টন। কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমানোর জন্য ইইউর একটি সার্বিক লক্ষ্যমাত্রা আছে। কিন্তু ইইউর সদস্যদেশগুলোর আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা ভিন্ন।

ইইউর লক্ষ্য অর্জনে সব সদস্যের একমত হওয়া দরকার। কারণ, চলমান কপ-২৬ সম্মেলনে ইইউ একটি একক সংস্থা হিসেবে দর-কষাকষি করবে। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার বলছে, ২০১৮ সাল থেকে ইইউর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রির নিচে রাখতে ইইউর নীতি ও পদক্ষেপ প্রায় যথেষ্ট। ইইউ ২০৫০ সালের মধ্যে ‘কার্বন ডাই-অক্সাইড–নিরপেক্ষ’ হতে চায়।

এদিকে, মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনে যুক্তরাষ্ট্রের পরে রয়েছে রাশিয়া। দেশটির মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ ১২ দশমিক ৫ টন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমেছিল। কিন্তু পরে দেশটির কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন বাড়ে।

দেশটির জিডিপির ২০ শতাংশের বেশি ফসিল জ্বালানি থেকে আসে। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় মিথেন নির্গমনকারী দেশ। মিথেনের নির্গমন কমানোর ব্যাপারে চলমান জলবায়ু সম্মেলনে যে দেশগুলো অঙ্গীকার করেছে, তার মধ্যে রাশিয়া নেই। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার বলছে, দেশটির নীতি ও পদক্ষেপ মোটেই যথেষ্ট নয়।

আর বিগত দুই দশক ধরে ভারতের বার্ষিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ক্রমাগতভাবে বেড়েছে। তবে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে ভারতের মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন সবচেয়ে কম। এই সংখ্যা ১ দশমিক ৯ টন। ধনী ও অধিক শিল্পোন্নত দেশগুলোকে নির্গমন কমানোর দায়দায়িত্ব বেশি পালন করতে বলছে ভারত। দেশটির যুক্তি, এই দেশগুলো দায়দায়িত্ব বেশি নিতে হবে এ কারণে যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে।

ভারত নির্গমন কমানোর একটা লক্ষ্য স্থির করেছে। তারা এই লক্ষ্যকে তুলনামূলক ন্যায়সংগত বলছে। ভারতের বিদ্যুতের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো কয়লাভিত্তিক। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার বলছে, লক্ষ্য অর্জনে ভারতকে ২০৪০ সালের আগেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ধাপে ধাপে বন্ধ করতে হবে। নেট শূন্য নির্গমন লক্ষ্য অর্জনের জন্য ২০৭০ সাল নির্ধারণ করেছে ভারত। কিন্তু অন্য নির্গমনকারী দেশগুলোর তুলনায় এই সময়সীমা অনেক বেশি।

বাংলাদেশের উপর প্রভাব: বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, পৃথিবীর মোট গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্র শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ নিঃসরিত হয় বাংলাদেশে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরাই হব জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ ১০টি দেশের একটি। মূলত ভৌগোলিক অবস্থান, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, দারিদ্র্য ও সামাজিক সুরক্ষার অপ্রতুলতা বাংলাদেশের ঝুঁকিকে দিনকে দিন প্রসারিত করছে।

কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি তথা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তন্মধ্যে ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমিধ্বসের মাত্রাবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। আগে ১৫ কিংবা ২০ বছর পরপর বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও, বর্তমানে ২ থেকে ৩ বছর পরপরই বড় ধরনের দুর্যোগ হানা দিচ্ছে৷ এমনকি, ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফ্‌ট-এর তালিকায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ সম্ভাব্য ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। তাছাড়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের একাংশ সমুদ্র অতলে তলিয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

কার্বন মুক্ত শহর গড়তে আমাদের করণীয়: এ লক্ষ্য পূরণের প্রাথমিক ধাপেই আমাদেরকে তিনটি বিষয়ে মনযোগ দিতে হবে। তা হচ্ছে, জ্বালানি, শিল্পখাত ও পরিবহণ খাতের কার্বন নিঃসরন কমানো৷ তবেই কমে আসবে বায়ুতে কার্বনের পরিমাণ।

*  জ্বালানি খাত: নবায়নযোগ্য জ্বালানীর প্রসার ঘটানোর মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কম করতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, সোলার হোম সিস্টেমের কথা বলা যায়। সোলার হোম সিস্টেম ছাড়াও সৌরশক্তি ব্যবহার করে সেচের পাম্প চালানো, প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাস্তায় সৌরশক্তি চালিত লাইটের ব্যবস্থা করা, পিকো সোলার সিস্টেম, গ্রিড টাই সোলার ইত্যাদির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস তৈরি করতে হবে৷ এতে করে আমাদের বনভূমির পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।

*  শিল্প খাত: শিল্পখাতে আমাদেরকে প্রথমে নজর দিতে হবে শিল্প কারখানা গুলোর অবস্থানের দিকে। কারখানা গুলোকে শহরের প্রধানতম সড়ক এবং বসতির বাইরে নিয়ে যেতে হবে এবং কারখানার জন্যেও আলাদা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তাঁদের উপর কার্বন নিঃসরন কমানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে, তাদের উপর ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে।

* পরিবহন খাত: পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ব্যাক্তিগত গাড়ির পরিমাণ কমাতে হবে। এক্ষেত্রে, মেট্রোরেল, পাতাল রেল, ট্রাম ইত্যাদি প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের শহর এবং শহরবাসীকে পরিচয় করাতে হবে। পাশাপাশি নৌ পথে যাতায়ত সহজ এবং নিরাপদ করার দিকে মনযোগ দিতে হবে। এতে কার্বন নিঃসরন অনেকাংশে কমে যাবে।

তাই আমাদের নগর গুলোকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া হিসেবে আমাদেরকে অবশ্যই উপরোক্ত খাতগুলোতে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমাতে হবে এবং পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, জ্বালানী ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পর্যটন ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।

কার্বন মুক্ত শহর গড়তে প্রয়োজনীয় বনভূমি স্থাপন: কার্বন নিঃসরণ কমানোর অন্যতম একটি বড় পদক্ষেপ বনভূমির প্রসার। একটি শহরের মোট আয়তনের অন্ততপক্ষে এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ পঁচিশ শতাংশ এলাকা জুড়ে বনভূমি থাকতে হবে। কিন্তু সরকারী হিসেব মতে, আমাদের শহরগুলোতে বনভূমির পরিমাণ গড়ে দশ শতাংশের কিছু বেশি মাত্র। তাই পরিবেশ রক্ষায় এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের নগর গুলোকে সাজানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বনভূমির জায়গা করে নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন, অবৈধ দখলদারিত্বের উচ্ছেদ, সরকারী কঠোর নির্দেশনা, দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং পতিত জায়গা গুলোর পূর্ণ ব্যবহার।

যান্ত্রিক জীবনে সবুজ প্রকৃতির স্পর্শ আনতে পারলেই এ লক্ষ্যে অনেকখানি এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব বেসামরিক মানুষজনকে সার্বিকভাবে বনায়নে উৎসাহিত করা। এক্ষেত্রে ছাদকৃষি একটি উত্তম এবং উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখতে পারে। এ ধরণের বনায়ন আমাদেরকে একদিকে যেমন শহরের বনভূমি বৃদ্ধিতে, সর্বোপরি প্রাকৃতিক ভারসাম্য তৈরীতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মুনাফাও দান করবে। প্রশাসন চাইলেই এ ধরণের উদ্যোগকে জনপ্রিয় করতে পারে। যেমন,
 *  “যেসব বাড়িতে ন্যূনতম ৫ টি গাছ থাকবে, তাঁদের ২০% আয়কর মওকুফ করা হবে।” -এমন একটি ঘোষণার মাধ্যমে খুব সহজেই নগর কৃষিকে জনপ্রিয় করা সম্ভব। এক্ষেত্রে পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারেন।

*  “নগরের বাড়ি গুলোর মাঝে, অন্তত পাশাপাশি অবস্থান করা প্রতি দুটো বাড়ির বাসিন্দাগণ তাঁদের মাঝে যে বাউন্ডারী সীমাটি ব্যবহার করেন, সেই বাউন্ডারীটি ইট-পাথরের না হয়ে, গড়ে তোলা হোক বড় পাঁচ-ছয়টি গাছের মাধ্যমে। অর্থাৎ সাধারনভাবে আপনার বাড়ী এবং আমার বাড়ির মাঝে যে বাউন্ডারীর দেয়াল তুলে সীমানা চিহ্নিত করি আমরা, সেই সীমানাটিকে আমরা চাইলেই ইট-পাথরের বদলে গাছের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে পারি।

*  এতে করে পরিবেশে বৃক্ষরোপণ যেমন বাড়বে, একই সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে আমাদের আন্তঃ সামাজিক যোগাযোগ। বৃদ্ধি পাবে আমাদের পারস্পরিক মেলামেশা। বাচ্চাদের জন্য বাড়বে খেলাধুলার জায়গা। সর্বোপরি বাড়বে আবহমানকাল থেকে চলে আসা আমাদের সামাজিক ভার্তৃত্বের অটুট বন্ধন।” – আপাতদৃষ্টে প্রস্তাবটি বাস্তবতা বিমুখী মনে হলেও, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে এটি বাস্তবায়ন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

প্রযুক্তি তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর প্রয়োগ বৃদ্ধি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে ফসিল ফুয়েল খরচ হয়, এমন কার্যক্রম কমিয়ে আনতে হবে। প্রযুক্তি গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শহরের বাসিন্দাদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, বিনোদন ব্যবস্থা, সবুজে ঘেরা খোলামেলা পরিবেশ সবই নিশ্চিত করতে হবে ৫ মিনিটের হাঁটার দূরত্বের মধ্যেই।

কার্বন অফসেট পদ্ধতি: প্রকৃতপক্ষে, বেশির ভাগ জলবায়ু মডেল ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে শত কোটি মেট্রিক টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড অপসারণ করার পাশাপাশি কার্বন হ্রাসের গতি বাড়িয়ে তোলার কথা বলে। বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণ করার কার্যকর ও প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে ‘কার্বন অফসেট’ পদ্ধতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

এ পদ্ধতিতে বায়ুমণ্ডলে যারা কার্বন নির্গমন করে, তারা সেই কার্বনকে অপসারণ করার জন্য অন্যদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থায়ন করবে। ক্ষতিগ্রস্তরা রিজেনারেটিভ বা পুনরুৎপাদন পদ্ধতিতে গাছ লাগিয়ে বা চাষাবাদ করে অথবা কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণ করে মাটিতে সংরক্ষণ করে রাখবে। কার্বন নির্গমনকারী গ্রুপ কার্বন অপসারণকারী গ্রুপকে অর্থায়ন করবে।

কার্বন নিঃসরণ কমাতে জাতিসংঘের ভূমিকা: কার্বন নিঃসরণের ভয়াবহতা দৃশ্যমান হওয়ার পরপরই গত শতাব্দীর শেষ দশকে ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিও -তে আয়োজিত হয় বিশ্ব আর্থ সামিট। বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমাতে সেখানে বেশকিছু পরিকল্পনা ও কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়, যার দরুণ ১৯৯৪ সালে তৈরী হয় জাতিসংঘের জলবায়ু দেখভাল সংস্থা ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’, সংক্ষেপে যা ইউএনএফসিসিসি নামে পরিচিত।

১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিবছরই ইউএনএফসিসিসি’র তত্ত্বাবধানে বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্রের সমন্বয়ে আয়োজিত হয় বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। এই সম্মেলন গুলো কোপ বা কনফারেন্স অব পার্টিস হিসেবে সমধিক পরিচিতি লাভ করে। এখনও অবধি প্রায় ২৬ টি কোপ সম্মেলন আয়োজিত হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৯ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর অবধি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে ২৬ তম কোপ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

এসব সম্মেলনে সাধারণত বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের হার কমানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে ঐক্যমত্যে পৌছায় বিশ্বের শিল্পোন্নত সকল রাষ্ট্র। এখনও সবচেয়ে অবধি গুরুত্বপূর্ণ কোপ সম্মেলন গুলোর মধ্যে ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত কোপ-০৩ এ গৃহীত কিয়েটো প্রোটোকল এবং ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত কোপ-২১ এ গৃহীত প্যারিস চুক্তি অন্যতম।

২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনের আগে বিভিন্ন দেশকে স্বপ্রণোদিত হয়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করতে অনুরোধ করে জাতিসংঘ৷ ২০৩০ সালের পূর্বেই প্রত্যেক দেশ অন্তত ৫ শতাংশ হারে কার্বন নিঃসরন করতে উদ্যোগী হয়েছে। বাংলাদেশও ইতোমধ্যে এ লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে।

সম্প্রতি শেষ হওয়া কোপ-২৬ সম্মেলনে কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্রসমূহ। সম্মেলনে ১৪০টির বেশি দেশ এ শতাব্দীর মাঝ নাগাদ কার্বন ও গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ ও শোষণ সমান করা বা ‘নেট জিরো’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বাইরে চীন ২০৬০ এবং ভারত ২০৭০ সাল নাগাদ এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সময়কাল নির্ধারণ করেছে।

কার্বনমুক্ত শহর গড়তে নগর পরিকল্পনাবিদদের ভূমিকা: এ ধরণের শহর গড়তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে নগর পরিকল্পনাবিদদেরকে। সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নগর পরিকল্পনাবিদগণ অনেকাংশেই কাজে বাঁধার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। রাজনৈতিক ভাবে কিংবা প্রশাসনিকভাবে নানা রকমের বাহ্যিক চাপের মুখ পরিকল্পনাবিদগণ প্রায়শই অসহায় হয়ে পড়েন এবং নিজেদের সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ঘটাতে পারেন না।

তাই কার্বন মুক্ত শহর গড়ার বিষয়টি নগর পরিকল্পনাতে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভূক্তিকরণ এবং সুষ্ঠু বাস্তবায়ন দেখতে চাইলে পরিকল্পনাবিদগণের হাতে অবশ্যই পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রদান করতে হবে এবং একই সঙ্গে কাজের তদারকি করার সুযোগ দিতে হবে। এতে পরিকল্পনাবিদগণ শহরের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজদের মতো করে পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবেন এবং সকল দিকে সমান গুরুত্ব দিতে পারবেন। তবেই কেবল শতভাগ নিশ্চয়তার সঙ্গে কার্বন মুক্ত শহর তৈরীর বিষয়টি পরিকল্পনায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
পরিশেষে, আমরা তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের নাগরিক। আমাদের জাতিগত অস্তিত্ব রক্ষার্থে কার্বন নিঃসরণ কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমরা যদি এটি নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ না গ্রহণ করি, তবে ভবিষ্যতে দেশের প্রত্যেক নাগরিককেই এর কুফল ভোগ করতে হবে। তাই নগর পরিকল্পনায় কার্বন মুক্ত শহর তৈরী নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা পরিকল্পনাবিদ এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেহাদ 
ট্যাগ:

কার্বন মুক্ত শহর গড়তে আমাদের করণীয়

প্রকাশ: ০৪:৪০:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৪

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল:

বিশ্বজুড়ে দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে গড় তাপমাত্রার পরিমাণ। দৃশ্যমান হয়ে উঠছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব। নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দূর্ঘটনায় বিপন্ন হয়ে ইতোমধ্যে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়েছে সহস্রাধিক প্রজাতির পশুপাখি। গোটা মানবজাতির জন্য সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। ইতোপূর্বে মুখোমুখি হওয়া কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগই মানবজাতিকে এতো ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন করেনি। অথচ ত্রাস ছড়ানো এই বিপদের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে গুটিকয়েক প্রাকৃতিক গ্যাস! প্রকৃতিতে নাগিনীর বিষাক্ত নিশ্বাস ছাড়ছে গ্যাস গুলোর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। বিপদসংকুল পৃথিবী এখন অস্তিত্ব সংকটে। এমতাবস্থায়, যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে আনা না হয়, তবে ক্রমাগত বেড়েই চলবে জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল। আর এই দুর্যোগ মোকাবিলার জন্যেই অপরিহার্য কার্বন মুক্ত শহর তৈরী।

কার্বন মুক্ত শহর কী? কার্বন মুক্ত শহর বলতে সাধারণত এমন কোনো শহরকে বুঝায়, যেখানে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ থাকবে শুন্যের কোটায়। বাস্তবিক অর্থে, কোনো অঞ্চল বা শহর যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন করে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কার্বন শোষণক্ষম হতে পারলেই, সেই শহর বা অঞ্চলকে কার্বনমুক্ত হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। যেমন: সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাসদার সিটি এবং চীনের ডংটান শহর। উক্ত দুটো শহরই কার্বন নিঃসরণ ও শোষণের দৃশ্যমান পার্থক্য তৈরী পূর্বক কার্বনমুক্ত শহর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

কার্বন মুক্ত শহর তৈরীর প্রয়োজনীয়তা ও প্রেক্ষাপট: সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণা রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে, শিল্প বিপ্লবের পর মানুষ বায়ুমণ্ডলে দুই হাজার গিগাটনের বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত করেছে। তাপ শোষণকারী গ্রিনহাউজ গ্যাস বায়ুমণ্ডলে যে আবরণ তৈরি করেছে, তার ফল হিসেবে আমরা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্মুখীন হয়েছি।

বায়ুমণ্ডলে আমরা যত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করি, তার অর্ধেকটা শুধু সেখানে থাকে, বাকিটা সমুদ্র ও জীবমণ্ডলে পুনঃ সঞ্চালিত হয়। কিন্তু সমুদ্র যত দ্রুত অভিসিঞ্চিত হচ্ছে এবং যত তার শোষণক্ষমতা কমছে, ততই এই পুনঃ সঞ্চালনের হার কমছে। একইভাবে তাপমাত্রা বাড়লে মাটির কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের হারও বাড়ে, এতে পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বাড়ে।

যদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এই গতি কমিয়ে আনা না হয়, গ্রিন হাউস গ্যাসের দ্রুত নির্গমন রোধ না করা হয়, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল, যেমন দাবানল, তাপপ্রবাহ, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা ইত্যাদির প্রভাব বেড়েই চলবে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসকরণের যোগসূত্র এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর তাই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জরুরী আহবান- কার্বন নিঃসরণ কমানো তথা কার্বন মুক্ত শহর তৈরী।

কার্বন নিঃসরণ এবং পরিবেশে এর প্রভাব: পেট্রোল, ডিজেল, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাসসহ প্রায় সকল জীবাশ্ম জ্বালানিতেই কার্বন বিদ্যমান এবং তা পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন করলে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়। ক্ষুদ্রার্থে, এটিই কার্বন নিঃসরণ। এর ফলে পরিবেশ ও জনজীবন মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে।

কার্বন এর মাত্রাধিক্যতা, বিশাল নির্গমন- আমাদের শহরগুলোকে অনেক বেশি অনিরাপদ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে গড়ে তুলেছে। শুধুমাত্র চীন এবং আমেরিকা মিলেই প্রায় ৫০% এর কাছাকাছি কার্বন নির্গমন করছে। পরিবেশের এই মারাত্মক দূষণের ফলে প্রতি বছর মারা যাচ্ছে লাখো মানুষ। নিধন হচ্ছে সবুজ বৃক্ষ। বেড়ে চলেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

খোদ জাতিসংঘের তথ্যমতে, শুধুমাত্র অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের জন্য ২০১২ সালে বিশ্বে ১২.৬ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিলো। জাতিসংঘের অন্য আরেকটি প্রতিবেদন মতে, বিশ্বে প্রতি ১০ টি শহরের মাঝে ১ টিরও কম শহর স্বাস্থ্যকর জলবায়ু নিশ্চায়নে কাজ করে!

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫-২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম রাখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব রোধ করার জন্য এটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু, আমাদের শুধু কার্বন নিঃসরণ কমালেই হবে না, বরং বায়ুমণ্ডল থেকে কিছু কার্বন অপসারণ করে তা সংরক্ষণও করতে হবে।

কার্বন নিঃসরণের বাস্তবিক চিত্র: বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন সমূহ কিংবা বিশ্ব মোড়লদের হাঁকডাক সত্ত্বেও বিশ্বে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা হতাশার উদ্রেক ঘটায়। বিশ্বের বেশির ভাগ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের জন্য দায়ী মাত্র চারটি দেশ (চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ভারত) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি সীমিত রাখার লক্ষ্যে নির্গমন কমাতে এই চার দেশ ও ইইউ ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। কিন্তু তারপরও তেমন কোনো বড় পদক্ষেপ নেয়নি তাঁরা।

চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনকারী দেশ। বৈশ্বিক নির্গমনের এক-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী চীন। বিশেষ করে কয়লা নির্ভরতার কারণে দেশটির কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন এখনো বাড়ছে। চীনের মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ ৮ দশমিক ১ টন।

চীন ২০২৬ সাল থেকে কয়লার ব্যবহার কমানোর অঙ্গীকার করেছে। বিদেশে নতুন কয়লা ভিত্তিক প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করবে বলে গত মাসে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। চীনা প্রেসিডেন্টের এমন ঘোষণা সত্ত্বেও দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে কয়লাখনি গুলোকে উৎপাদন বাড়াতে বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলছে, চীনকে তার জলবায়ু সংক্রান্ত লক্ষ্য অর্জনে ২০৬০ সালের মধ্যে কয়লার চাহিদা ৮০ শতাংশের বেশি কমাতে হবে। অপর গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেনের নির্গমন ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ কমানোর ব্যাপারে চলমান জলবায়ু সম্মেলনে অঙ্গীকার করেছে শতাধিক দেশ। কিন্তু এই দেশগুলোর মধ্যে চীন নেই।

নজরদারি সংস্থা ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার’ বলছে, চীনের নীতি ও পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। সব দেশ যদি একই পথ অনুসরণ করে, তাহলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। চীন ২০৬০ সালের মধ্য ‘কার্বন ডাই-অক্সাইড–নিরপেক্ষ’ হওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

অন্যদিকে, বিশ্বে মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের দিক দিয়ে সবার ওপরে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ ১৫ দশমিক ৫ টন। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির ৮০ শতাংশের বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সবুজ জ্বালানির আওতা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে গত এক দশকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমছে। তবে ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য অনুযায়ী বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে দেশটির বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যুক্তরাষ্ট্র ২০৫০ সালের মধ্যে ‘কার্বন ডাই-অক্সাইড-নিরপেক্ষ’ হওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

এছাড়া, ইইউতে সবচেয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনকারী দেশগুলো হলো জার্মানি, ইতালি ও পোল্যান্ড। ইইউতে মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ ৬ দশমিক ৫ টন। কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমানোর জন্য ইইউর একটি সার্বিক লক্ষ্যমাত্রা আছে। কিন্তু ইইউর সদস্যদেশগুলোর আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা ভিন্ন।

ইইউর লক্ষ্য অর্জনে সব সদস্যের একমত হওয়া দরকার। কারণ, চলমান কপ-২৬ সম্মেলনে ইইউ একটি একক সংস্থা হিসেবে দর-কষাকষি করবে। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার বলছে, ২০১৮ সাল থেকে ইইউর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রির নিচে রাখতে ইইউর নীতি ও পদক্ষেপ প্রায় যথেষ্ট। ইইউ ২০৫০ সালের মধ্যে ‘কার্বন ডাই-অক্সাইড–নিরপেক্ষ’ হতে চায়।

এদিকে, মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনে যুক্তরাষ্ট্রের পরে রয়েছে রাশিয়া। দেশটির মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ ১২ দশমিক ৫ টন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমেছিল। কিন্তু পরে দেশটির কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন বাড়ে।

দেশটির জিডিপির ২০ শতাংশের বেশি ফসিল জ্বালানি থেকে আসে। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় মিথেন নির্গমনকারী দেশ। মিথেনের নির্গমন কমানোর ব্যাপারে চলমান জলবায়ু সম্মেলনে যে দেশগুলো অঙ্গীকার করেছে, তার মধ্যে রাশিয়া নেই। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার বলছে, দেশটির নীতি ও পদক্ষেপ মোটেই যথেষ্ট নয়।

আর বিগত দুই দশক ধরে ভারতের বার্ষিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ক্রমাগতভাবে বেড়েছে। তবে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে ভারতের মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন সবচেয়ে কম। এই সংখ্যা ১ দশমিক ৯ টন। ধনী ও অধিক শিল্পোন্নত দেশগুলোকে নির্গমন কমানোর দায়দায়িত্ব বেশি পালন করতে বলছে ভারত। দেশটির যুক্তি, এই দেশগুলো দায়দায়িত্ব বেশি নিতে হবে এ কারণে যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে।

ভারত নির্গমন কমানোর একটা লক্ষ্য স্থির করেছে। তারা এই লক্ষ্যকে তুলনামূলক ন্যায়সংগত বলছে। ভারতের বিদ্যুতের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো কয়লাভিত্তিক। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার বলছে, লক্ষ্য অর্জনে ভারতকে ২০৪০ সালের আগেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ধাপে ধাপে বন্ধ করতে হবে। নেট শূন্য নির্গমন লক্ষ্য অর্জনের জন্য ২০৭০ সাল নির্ধারণ করেছে ভারত। কিন্তু অন্য নির্গমনকারী দেশগুলোর তুলনায় এই সময়সীমা অনেক বেশি।

বাংলাদেশের উপর প্রভাব: বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, পৃথিবীর মোট গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্র শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ নিঃসরিত হয় বাংলাদেশে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরাই হব জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ ১০টি দেশের একটি। মূলত ভৌগোলিক অবস্থান, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, দারিদ্র্য ও সামাজিক সুরক্ষার অপ্রতুলতা বাংলাদেশের ঝুঁকিকে দিনকে দিন প্রসারিত করছে।

কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি তথা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তন্মধ্যে ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমিধ্বসের মাত্রাবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। আগে ১৫ কিংবা ২০ বছর পরপর বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও, বর্তমানে ২ থেকে ৩ বছর পরপরই বড় ধরনের দুর্যোগ হানা দিচ্ছে৷ এমনকি, ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফ্‌ট-এর তালিকায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ সম্ভাব্য ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। তাছাড়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের একাংশ সমুদ্র অতলে তলিয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

কার্বন মুক্ত শহর গড়তে আমাদের করণীয়: এ লক্ষ্য পূরণের প্রাথমিক ধাপেই আমাদেরকে তিনটি বিষয়ে মনযোগ দিতে হবে। তা হচ্ছে, জ্বালানি, শিল্পখাত ও পরিবহণ খাতের কার্বন নিঃসরন কমানো৷ তবেই কমে আসবে বায়ুতে কার্বনের পরিমাণ।

*  জ্বালানি খাত: নবায়নযোগ্য জ্বালানীর প্রসার ঘটানোর মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কম করতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, সোলার হোম সিস্টেমের কথা বলা যায়। সোলার হোম সিস্টেম ছাড়াও সৌরশক্তি ব্যবহার করে সেচের পাম্প চালানো, প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাস্তায় সৌরশক্তি চালিত লাইটের ব্যবস্থা করা, পিকো সোলার সিস্টেম, গ্রিড টাই সোলার ইত্যাদির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস তৈরি করতে হবে৷ এতে করে আমাদের বনভূমির পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।

*  শিল্প খাত: শিল্পখাতে আমাদেরকে প্রথমে নজর দিতে হবে শিল্প কারখানা গুলোর অবস্থানের দিকে। কারখানা গুলোকে শহরের প্রধানতম সড়ক এবং বসতির বাইরে নিয়ে যেতে হবে এবং কারখানার জন্যেও আলাদা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তাঁদের উপর কার্বন নিঃসরন কমানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে, তাদের উপর ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে।

* পরিবহন খাত: পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ব্যাক্তিগত গাড়ির পরিমাণ কমাতে হবে। এক্ষেত্রে, মেট্রোরেল, পাতাল রেল, ট্রাম ইত্যাদি প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের শহর এবং শহরবাসীকে পরিচয় করাতে হবে। পাশাপাশি নৌ পথে যাতায়ত সহজ এবং নিরাপদ করার দিকে মনযোগ দিতে হবে। এতে কার্বন নিঃসরন অনেকাংশে কমে যাবে।

তাই আমাদের নগর গুলোকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া হিসেবে আমাদেরকে অবশ্যই উপরোক্ত খাতগুলোতে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমাতে হবে এবং পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, জ্বালানী ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পর্যটন ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।

কার্বন মুক্ত শহর গড়তে প্রয়োজনীয় বনভূমি স্থাপন: কার্বন নিঃসরণ কমানোর অন্যতম একটি বড় পদক্ষেপ বনভূমির প্রসার। একটি শহরের মোট আয়তনের অন্ততপক্ষে এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ পঁচিশ শতাংশ এলাকা জুড়ে বনভূমি থাকতে হবে। কিন্তু সরকারী হিসেব মতে, আমাদের শহরগুলোতে বনভূমির পরিমাণ গড়ে দশ শতাংশের কিছু বেশি মাত্র। তাই পরিবেশ রক্ষায় এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের নগর গুলোকে সাজানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বনভূমির জায়গা করে নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন, অবৈধ দখলদারিত্বের উচ্ছেদ, সরকারী কঠোর নির্দেশনা, দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং পতিত জায়গা গুলোর পূর্ণ ব্যবহার।

যান্ত্রিক জীবনে সবুজ প্রকৃতির স্পর্শ আনতে পারলেই এ লক্ষ্যে অনেকখানি এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব বেসামরিক মানুষজনকে সার্বিকভাবে বনায়নে উৎসাহিত করা। এক্ষেত্রে ছাদকৃষি একটি উত্তম এবং উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখতে পারে। এ ধরণের বনায়ন আমাদেরকে একদিকে যেমন শহরের বনভূমি বৃদ্ধিতে, সর্বোপরি প্রাকৃতিক ভারসাম্য তৈরীতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মুনাফাও দান করবে। প্রশাসন চাইলেই এ ধরণের উদ্যোগকে জনপ্রিয় করতে পারে। যেমন,
 *  “যেসব বাড়িতে ন্যূনতম ৫ টি গাছ থাকবে, তাঁদের ২০% আয়কর মওকুফ করা হবে।” -এমন একটি ঘোষণার মাধ্যমে খুব সহজেই নগর কৃষিকে জনপ্রিয় করা সম্ভব। এক্ষেত্রে পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারেন।

*  “নগরের বাড়ি গুলোর মাঝে, অন্তত পাশাপাশি অবস্থান করা প্রতি দুটো বাড়ির বাসিন্দাগণ তাঁদের মাঝে যে বাউন্ডারী সীমাটি ব্যবহার করেন, সেই বাউন্ডারীটি ইট-পাথরের না হয়ে, গড়ে তোলা হোক বড় পাঁচ-ছয়টি গাছের মাধ্যমে। অর্থাৎ সাধারনভাবে আপনার বাড়ী এবং আমার বাড়ির মাঝে যে বাউন্ডারীর দেয়াল তুলে সীমানা চিহ্নিত করি আমরা, সেই সীমানাটিকে আমরা চাইলেই ইট-পাথরের বদলে গাছের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে পারি।

*  এতে করে পরিবেশে বৃক্ষরোপণ যেমন বাড়বে, একই সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে আমাদের আন্তঃ সামাজিক যোগাযোগ। বৃদ্ধি পাবে আমাদের পারস্পরিক মেলামেশা। বাচ্চাদের জন্য বাড়বে খেলাধুলার জায়গা। সর্বোপরি বাড়বে আবহমানকাল থেকে চলে আসা আমাদের সামাজিক ভার্তৃত্বের অটুট বন্ধন।” – আপাতদৃষ্টে প্রস্তাবটি বাস্তবতা বিমুখী মনে হলেও, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে এটি বাস্তবায়ন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

প্রযুক্তি তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর প্রয়োগ বৃদ্ধি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে ফসিল ফুয়েল খরচ হয়, এমন কার্যক্রম কমিয়ে আনতে হবে। প্রযুক্তি গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শহরের বাসিন্দাদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, বিনোদন ব্যবস্থা, সবুজে ঘেরা খোলামেলা পরিবেশ সবই নিশ্চিত করতে হবে ৫ মিনিটের হাঁটার দূরত্বের মধ্যেই।

কার্বন অফসেট পদ্ধতি: প্রকৃতপক্ষে, বেশির ভাগ জলবায়ু মডেল ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে শত কোটি মেট্রিক টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড অপসারণ করার পাশাপাশি কার্বন হ্রাসের গতি বাড়িয়ে তোলার কথা বলে। বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণ করার কার্যকর ও প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে ‘কার্বন অফসেট’ পদ্ধতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

এ পদ্ধতিতে বায়ুমণ্ডলে যারা কার্বন নির্গমন করে, তারা সেই কার্বনকে অপসারণ করার জন্য অন্যদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থায়ন করবে। ক্ষতিগ্রস্তরা রিজেনারেটিভ বা পুনরুৎপাদন পদ্ধতিতে গাছ লাগিয়ে বা চাষাবাদ করে অথবা কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণ করে মাটিতে সংরক্ষণ করে রাখবে। কার্বন নির্গমনকারী গ্রুপ কার্বন অপসারণকারী গ্রুপকে অর্থায়ন করবে।

কার্বন নিঃসরণ কমাতে জাতিসংঘের ভূমিকা: কার্বন নিঃসরণের ভয়াবহতা দৃশ্যমান হওয়ার পরপরই গত শতাব্দীর শেষ দশকে ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিও -তে আয়োজিত হয় বিশ্ব আর্থ সামিট। বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমাতে সেখানে বেশকিছু পরিকল্পনা ও কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়, যার দরুণ ১৯৯৪ সালে তৈরী হয় জাতিসংঘের জলবায়ু দেখভাল সংস্থা ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’, সংক্ষেপে যা ইউএনএফসিসিসি নামে পরিচিত।

১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিবছরই ইউএনএফসিসিসি’র তত্ত্বাবধানে বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্রের সমন্বয়ে আয়োজিত হয় বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। এই সম্মেলন গুলো কোপ বা কনফারেন্স অব পার্টিস হিসেবে সমধিক পরিচিতি লাভ করে। এখনও অবধি প্রায় ২৬ টি কোপ সম্মেলন আয়োজিত হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৯ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর অবধি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে ২৬ তম কোপ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

এসব সম্মেলনে সাধারণত বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের হার কমানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে ঐক্যমত্যে পৌছায় বিশ্বের শিল্পোন্নত সকল রাষ্ট্র। এখনও সবচেয়ে অবধি গুরুত্বপূর্ণ কোপ সম্মেলন গুলোর মধ্যে ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত কোপ-০৩ এ গৃহীত কিয়েটো প্রোটোকল এবং ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত কোপ-২১ এ গৃহীত প্যারিস চুক্তি অন্যতম।

২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনের আগে বিভিন্ন দেশকে স্বপ্রণোদিত হয়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করতে অনুরোধ করে জাতিসংঘ৷ ২০৩০ সালের পূর্বেই প্রত্যেক দেশ অন্তত ৫ শতাংশ হারে কার্বন নিঃসরন করতে উদ্যোগী হয়েছে। বাংলাদেশও ইতোমধ্যে এ লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে।

সম্প্রতি শেষ হওয়া কোপ-২৬ সম্মেলনে কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্রসমূহ। সম্মেলনে ১৪০টির বেশি দেশ এ শতাব্দীর মাঝ নাগাদ কার্বন ও গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ ও শোষণ সমান করা বা ‘নেট জিরো’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বাইরে চীন ২০৬০ এবং ভারত ২০৭০ সাল নাগাদ এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সময়কাল নির্ধারণ করেছে।

কার্বনমুক্ত শহর গড়তে নগর পরিকল্পনাবিদদের ভূমিকা: এ ধরণের শহর গড়তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে নগর পরিকল্পনাবিদদেরকে। সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নগর পরিকল্পনাবিদগণ অনেকাংশেই কাজে বাঁধার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। রাজনৈতিক ভাবে কিংবা প্রশাসনিকভাবে নানা রকমের বাহ্যিক চাপের মুখ পরিকল্পনাবিদগণ প্রায়শই অসহায় হয়ে পড়েন এবং নিজেদের সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ঘটাতে পারেন না।

তাই কার্বন মুক্ত শহর গড়ার বিষয়টি নগর পরিকল্পনাতে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভূক্তিকরণ এবং সুষ্ঠু বাস্তবায়ন দেখতে চাইলে পরিকল্পনাবিদগণের হাতে অবশ্যই পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রদান করতে হবে এবং একই সঙ্গে কাজের তদারকি করার সুযোগ দিতে হবে। এতে পরিকল্পনাবিদগণ শহরের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজদের মতো করে পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবেন এবং সকল দিকে সমান গুরুত্ব দিতে পারবেন। তবেই কেবল শতভাগ নিশ্চয়তার সঙ্গে কার্বন মুক্ত শহর তৈরীর বিষয়টি পরিকল্পনায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
পরিশেষে, আমরা তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের নাগরিক। আমাদের জাতিগত অস্তিত্ব রক্ষার্থে কার্বন নিঃসরণ কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমরা যদি এটি নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ না গ্রহণ করি, তবে ভবিষ্যতে দেশের প্রত্যেক নাগরিককেই এর কুফল ভোগ করতে হবে। তাই নগর পরিকল্পনায় কার্বন মুক্ত শহর তৈরী নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা পরিকল্পনাবিদ এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেহাদ