০২:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

নেতাজী ভবনে একদিন

নেতাজী ভবন ।। ফাইল ছবি

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল: দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে এলজিন রোডস্থ (বর্তমান লালা লাজপথ রায় সরণী) ৩৮/২ নং বাড়ী; নাম, নেতাজী ভবন। ভবানীপুর অঞ্চলের কলকাতা মেট্রো স্টেশনটির নাম এই বাড়ির নামানুসারে ‘নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশন’ রাখা হয়েছে। ইংরেজ শাসনের অত্যাচার থেকে ভারতবাসীর মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার শতবর্ষী এই আবাস। বাঙালী ইতিহাসের অন্যতম পুরোধা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বাসভবন। ১৯০৯ সালে সুভাষচন্দ্রের বাবা জানকীনাথ বসু এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। একের পর এক কিংবদন্তীগাঁথা এই বাড়িকে ঘিরে। প্রথমবার কলকাতায় পা রাখার পর থেকেই মনস্থির করেছিলাম, অন্য কোথাও যাবার সুযোগ হোক কিংবা না হোক, নেতাজীর বাড়িতে যদি না যাই, তাহলে আমার ভারত ভ্রমণ বৃথা!

ভাবনানুসারেই, কলকাতায় আমাদের অবস্থানের দ্বিতীয় দিনে গোটা পরিবার সমেত হাজির হলাম নেতাজী ভবনে, যা বর্তমানে নেতাজী রিসার্চ ব্যুরো এবং নেতাজী মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঘড়ির কাটায় তখন বেলা একটা প্রায়, শুক্রবার। যাবার আগে গুগল মারফত মিউজিয়ামের যোগাযোগ নাম্বার সংগ্রহ করে এই অবেলায় মিউজিয়াম খোলা থাকার ব্যপারে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছিলাম। মাত্র একশ রুপি ভাড়াতে কলকাতার ঐতিহ্য হলুদ অ্যাম্বাসেডরে করে ধর্মতলা থেকে এলজিন রোড পৌঁছে গেলাম। বাড়ীতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ টিকেটের মূল্য ২০ রুপি মাত্র। সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা অবধি দর্শনার্থীরা এখানে অবস্থান করতে পারেন। বিকেল সাড়ে চারটায় টিকেট বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। যাহোক, আমরা চারজনে চারটে টিকেট কেঁটে নিলাম। এবার পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখার পালা।

নেতাজীর বাড়িতে প্রবেশের শুরুতেই গ্রাউন্ড ফ্লোরে চোখে পড়বে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কড়া নজরবন্দি এড়িয়ে নেতাজীর মহাঅন্তর্ধানের সময় ব্যবহৃত গাড়ী। এই গাড়িতে করেই প্রথমে ঘর ছেড়ে আফগানিস্তান ও পরবর্তীতে জার্মানি পৌঁছান তিনি। এছাড়া, নেতাজীর কয়েকটি ছবি ও প্রতিকৃতি দেয়ালে দেখলাম। তবে নিচ তলার রুমগুলোতে শুরুতেই প্রবেশে বাঁধা দিলেন সেখানে অবস্থানরত নিরাপত্তা কর্মী। ইশারায় বলে দিলেন, দ্বিতীয় তলা থেকে ঘুরে দেখার পর্ব শুরু হবে। আমরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে এলাম। দেখে মনে হলো সিঁড়িগুলো খুব বেশি পুরোনো নয়। খুব সম্ভবত, পুরোনো সিঁড়িগুলো ব্যবহার অযোগ্য, তাই সংস্কার করা হয়েছে।

দু তলার রুমগুলো মূলত নেতাজী ব্যবহার করতেন। সেখানেই তাঁর শোবার ঘর; পাশেই রয়েছে তাঁর সহযোদ্ধা, বড় ভাই শরৎ চন্দ্র বসুর ব্যবহৃত রুম; দু ঘর পরেই নেতাজীর স্টাডি রুম, ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি থাকাকালে এই রুমটিই তিনি নিজের অফিস হিসেবে ব্যবহার করতেন। সবগুলো রুম চোখের তৃপ্তি মিটিয়ে ঘুরে দেখলাম। না বললেই নয়, দু তলার একটা জায়গায় শুরুতেই চোখ আটকে গিয়েছিলো! নেতাজীর রুমের পাশেই বারান্দায় বড় করে প্রথম যে ছবিটা টানানো রয়েছে, সেটা নেতাজীর ময়মনসিংহ আগমনের ছবি! ছবিটা বেশ বড় করে বাঁধাই করা। ছবির বর্ণনায় রয়েছে, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশের জেলা ময়মনসিংহের পন্ডিত বাড়িতে প্রদেশ কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে নেতাজী। ছবিটা বেশ নস্টালজিকই বটে! ১৯৪৭ এ দেশভাগের মাত্র বছর কয়েক আগের ছবি! কত মিল ছিলো দু বঙ্গের মানুষের মাঝে! কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিষাক্ততা ও নেতাজীর অনুপস্থিতি যে ভারতবাসীর জন্য কত বড় আকাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, তাঁর সামান্যতম উদাহরণ এই ছবিটি!

যাহোক, দ্বিতীয় তলার ঘোর কাঁটিয়ে তৃতীয় তলার দিকে অগ্রসর হলাম। এই তলাটাই মূলত নেতাজী রিসার্চ ব্যুরো ও মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গোটা ফ্লোর জুড়েই নেতাজীর ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন কর্মকান্ডের ছবি, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠকের ছবি, নেতাজী ব্যবহৃত বিভিন্ন পোশাক ও গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টসের অনুলিপি রাখা রয়েছে। এছাড়া, এই ফ্লোরে উঠতেই কানে ভেসে আসবে বিভিন্ন সময়ে দেয়া নেতাজীর বিভিন্ন বক্তব্যের রেকর্ডিং। দু তলা ও তিনতলা, উভয় ফ্লোরেই নেতাজীর বিভিন্ন আসবাবপত্র ও কর্মকান্ডের প্রমাণ চাক্ষুস করে আমরা চারজনেই তখন ঘোরের মাঝে রয়েছি! ইতোমধ্যে এই ফ্লোরে সাক্ষাৎ পেলাম বাংলাদেশের প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব শাহনাজ খুশির। আমার আব্বা আম্মা তাঁকে চিনেন চঞ্চল চৌধুরীর নায়িকা হিসেবে। জানতে পারলাম তিনি পরিবার নিয়ে নেতাজী ভবন পরিদর্শনে এসেছেন।

তৃতীয় তলা থেকে এক তলায় নেমে এলাম। এখানে যে রুমটি রয়েছে, যাতে প্রবেশে শুরুতেই নিরাপত্তাকর্মী বাঁধা দিয়েছিল, সেই রুমটা মূলত শরৎ চন্দ্র বসুর স্মৃতি রক্ষার্থে তৈরী। বাংলার ইতিহাসে স্বতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এই কিংবদন্তী ব্যক্তির। বললে অত্যুক্তি হবেনা, তাঁর আস্কারা ও সমর্থনেই বাঙালি পেয়েছিলো নেতাজীর মতো নক্ষত্র। এই রুম প্রদক্ষিণ শেষে পুনরায় চোখ পড়লো বারান্দায় রাখা নেতাজী প্রতিকৃতি ও তাঁর ব্যবহৃত গাড়ীর দিকে। এগুলোর সাথে ছবি উঠানোর সময়ই খেয়াল করলাম চঞ্চল চৌধুরীও তাঁর পরিবারের সাথে এসেছেন। বুঝতে বাকি রইলো না, দু বন্ধুই পরিবার সমেত একযোগে বেড়াতে এসেছেন। আমার বাবা আবার চঞ্চলের ভীষণ ভক্ত। তিনি আবার আমার ছোটবোনের ফ্যাকাল্টিরই সিনিয়র। খানিক সময় সেখানে সৌহার্দ্য বিনিময় হলো।

অতঃপর বিদায় পালা। হালকা ফটোশ্যুট শেষে পুনরায় ট্যাক্সি করে নিউমার্কেট এলাকায় চলে এলাম। ফেরার পথে ভিক্টোরিয়া, ময়দান, ব্রিগেড, ইডেন সবই দেখা হলো। তবে, কিছু কথা না বললেই নয়। নেতাজীর মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তির স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত জাদুঘরের অবস্থা আর দশটা সাধারণ জাদুঘরের মতোই মনে হলো। গুটিকয়েক ছবি ও ব্যবহৃত আসবাবপত্র ছাড়া তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছুই সাধারণ মানুষের দেখার ও জানার জন্য রাখা হয়নি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, সেখানে প্রতি তলায় মোতায়েন রাখা নিরাপত্তাকর্মীগণ নেতাজীর সম্পর্কে বলতে গেলে বিশেষ কিছুই জানেন না। আমি খানিক আলাপচারিতায় যা বুঝলাম, প্রত্যেকেই চাকরির সুবাদে এখানে দাড়িয়ে রয়েছেন। এসব কিংবদন্তীগাঁথার বিষয়ে কারুর তেমন জানার আগ্রহও লক্ষ্য করলাম না। দর্শনার্থীদের গাইড করার বিষয়ে এরা নিতান্তই অজ্ঞ ও মূর্খ।

মিউজিয়ামের দায়িত্বে থাকা কেয়ারটেকারকে বললাম, অন্তত একবার হলেও যেনো বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে নির্মিত জাদুঘর ভ্রমণ করে আসেন তিনি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ! বলতে বাধ্য হচ্ছি, নেতাজী জাদুঘর পরিদর্শনের পর বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেলো! একজন রাষ্ট্রনায়কের জাদুঘর কেমন হওয়া উচিত, তা তিনি বাঙালীকে শিখিয়েছেন। নেতাজী ভবনে নির্মিত জাদুঘরটি সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাও তেমন পায়না বলেই ধারণা করি। এত সাদামাটা একটা হাল দেখে মনে দুঃখবোধও কম হলো না! মন থেকে নেতাজীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি থাকলেই কেবল এই সাদামাটা জাদুঘরে চোখের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব। তথাপি, সাধারণ উৎসুক জনতা দেখতে গেলে নিরাশ হয়েই ফিরতে বাধ্য। নেতাজীর বংশধরদের প্রতি এক ধরণের অভক্তি জন্ম নিলো। কী লাভ এত শিক্ষিত হয়ে, যদি নিজের পরিবারের ঐতিহ্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে এত ভয় ও দালালির আশ্রয় নেয়া লাগে! শুধু বড় বড় কথা বললেই নেতা হওয়া যায়না, উত্তরাধিকার পেলেই বিশিষ্ট হওয়া যায়না! এর বড় প্রমাণ মনে হয় নেতাজীর বংশধরগণ।

নেতাজী সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই! বাঙালী তাঁর প্রিয় পুত্র সম্পর্কে সবই জানেন! ইতোপূর্বে আমি নিজেও আমার অনেক লেখনীতে তাঁর সম্পর্কে মুগ্ধতা ও মতামত প্রকাশ করেছি। নেতাজীর বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে মন্তব্য করেছি। আশপাশের সবাইকে বুঝাতে চেয়েছি তাঁর মহত্ব। তাঁর প্রতি হওয়া সকল অবিচার সম্পর্কে সোচ্চার হয়েছি। আমার বাসার সবাই আমার এই পাগলামো সম্পর্কে জানেন। প্রায় ১৩ বছর যাবত যে ব্যক্তিকে নিজের আদর্শিক গুরু মেনে এসেছি, তাঁর বাড়ীতে ভ্রমণ করতে পারাটা আমার জন্য রীতিমতো স্বাপ্নিক। আল্লাহ আমার সে স্বপ্ন পূরণ করেছেন। পরিবারের সবাইকে সঙ্গে করে নেতাজী ভবন পরিদর্শনের সুযোগ আল্লাহ করে দিয়েছেন। সেজন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি শেষহীন কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া!

তবে, স্বপ্নপূরণ ও হতাশার মিশ্র আবেশে বলতে চাই, আবারও ফিরবো এখানে। হয়তো নতুন কোন ইতিহাসের সূচনায় কিংবা পুরোনো ইতিহাসের স্মৃতিমন্থন করতে!

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেহাদ

ট্যাগ:

নেতাজী ভবনে একদিন

প্রকাশ: ০৬:৫৬:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৪

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল: দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে এলজিন রোডস্থ (বর্তমান লালা লাজপথ রায় সরণী) ৩৮/২ নং বাড়ী; নাম, নেতাজী ভবন। ভবানীপুর অঞ্চলের কলকাতা মেট্রো স্টেশনটির নাম এই বাড়ির নামানুসারে ‘নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশন’ রাখা হয়েছে। ইংরেজ শাসনের অত্যাচার থেকে ভারতবাসীর মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার শতবর্ষী এই আবাস। বাঙালী ইতিহাসের অন্যতম পুরোধা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বাসভবন। ১৯০৯ সালে সুভাষচন্দ্রের বাবা জানকীনাথ বসু এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। একের পর এক কিংবদন্তীগাঁথা এই বাড়িকে ঘিরে। প্রথমবার কলকাতায় পা রাখার পর থেকেই মনস্থির করেছিলাম, অন্য কোথাও যাবার সুযোগ হোক কিংবা না হোক, নেতাজীর বাড়িতে যদি না যাই, তাহলে আমার ভারত ভ্রমণ বৃথা!

ভাবনানুসারেই, কলকাতায় আমাদের অবস্থানের দ্বিতীয় দিনে গোটা পরিবার সমেত হাজির হলাম নেতাজী ভবনে, যা বর্তমানে নেতাজী রিসার্চ ব্যুরো এবং নেতাজী মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঘড়ির কাটায় তখন বেলা একটা প্রায়, শুক্রবার। যাবার আগে গুগল মারফত মিউজিয়ামের যোগাযোগ নাম্বার সংগ্রহ করে এই অবেলায় মিউজিয়াম খোলা থাকার ব্যপারে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছিলাম। মাত্র একশ রুপি ভাড়াতে কলকাতার ঐতিহ্য হলুদ অ্যাম্বাসেডরে করে ধর্মতলা থেকে এলজিন রোড পৌঁছে গেলাম। বাড়ীতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ টিকেটের মূল্য ২০ রুপি মাত্র। সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা অবধি দর্শনার্থীরা এখানে অবস্থান করতে পারেন। বিকেল সাড়ে চারটায় টিকেট বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। যাহোক, আমরা চারজনে চারটে টিকেট কেঁটে নিলাম। এবার পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখার পালা।

নেতাজীর বাড়িতে প্রবেশের শুরুতেই গ্রাউন্ড ফ্লোরে চোখে পড়বে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কড়া নজরবন্দি এড়িয়ে নেতাজীর মহাঅন্তর্ধানের সময় ব্যবহৃত গাড়ী। এই গাড়িতে করেই প্রথমে ঘর ছেড়ে আফগানিস্তান ও পরবর্তীতে জার্মানি পৌঁছান তিনি। এছাড়া, নেতাজীর কয়েকটি ছবি ও প্রতিকৃতি দেয়ালে দেখলাম। তবে নিচ তলার রুমগুলোতে শুরুতেই প্রবেশে বাঁধা দিলেন সেখানে অবস্থানরত নিরাপত্তা কর্মী। ইশারায় বলে দিলেন, দ্বিতীয় তলা থেকে ঘুরে দেখার পর্ব শুরু হবে। আমরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে এলাম। দেখে মনে হলো সিঁড়িগুলো খুব বেশি পুরোনো নয়। খুব সম্ভবত, পুরোনো সিঁড়িগুলো ব্যবহার অযোগ্য, তাই সংস্কার করা হয়েছে।

দু তলার রুমগুলো মূলত নেতাজী ব্যবহার করতেন। সেখানেই তাঁর শোবার ঘর; পাশেই রয়েছে তাঁর সহযোদ্ধা, বড় ভাই শরৎ চন্দ্র বসুর ব্যবহৃত রুম; দু ঘর পরেই নেতাজীর স্টাডি রুম, ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি থাকাকালে এই রুমটিই তিনি নিজের অফিস হিসেবে ব্যবহার করতেন। সবগুলো রুম চোখের তৃপ্তি মিটিয়ে ঘুরে দেখলাম। না বললেই নয়, দু তলার একটা জায়গায় শুরুতেই চোখ আটকে গিয়েছিলো! নেতাজীর রুমের পাশেই বারান্দায় বড় করে প্রথম যে ছবিটা টানানো রয়েছে, সেটা নেতাজীর ময়মনসিংহ আগমনের ছবি! ছবিটা বেশ বড় করে বাঁধাই করা। ছবির বর্ণনায় রয়েছে, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশের জেলা ময়মনসিংহের পন্ডিত বাড়িতে প্রদেশ কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে নেতাজী। ছবিটা বেশ নস্টালজিকই বটে! ১৯৪৭ এ দেশভাগের মাত্র বছর কয়েক আগের ছবি! কত মিল ছিলো দু বঙ্গের মানুষের মাঝে! কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিষাক্ততা ও নেতাজীর অনুপস্থিতি যে ভারতবাসীর জন্য কত বড় আকাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, তাঁর সামান্যতম উদাহরণ এই ছবিটি!

যাহোক, দ্বিতীয় তলার ঘোর কাঁটিয়ে তৃতীয় তলার দিকে অগ্রসর হলাম। এই তলাটাই মূলত নেতাজী রিসার্চ ব্যুরো ও মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গোটা ফ্লোর জুড়েই নেতাজীর ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন কর্মকান্ডের ছবি, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠকের ছবি, নেতাজী ব্যবহৃত বিভিন্ন পোশাক ও গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টসের অনুলিপি রাখা রয়েছে। এছাড়া, এই ফ্লোরে উঠতেই কানে ভেসে আসবে বিভিন্ন সময়ে দেয়া নেতাজীর বিভিন্ন বক্তব্যের রেকর্ডিং। দু তলা ও তিনতলা, উভয় ফ্লোরেই নেতাজীর বিভিন্ন আসবাবপত্র ও কর্মকান্ডের প্রমাণ চাক্ষুস করে আমরা চারজনেই তখন ঘোরের মাঝে রয়েছি! ইতোমধ্যে এই ফ্লোরে সাক্ষাৎ পেলাম বাংলাদেশের প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব শাহনাজ খুশির। আমার আব্বা আম্মা তাঁকে চিনেন চঞ্চল চৌধুরীর নায়িকা হিসেবে। জানতে পারলাম তিনি পরিবার নিয়ে নেতাজী ভবন পরিদর্শনে এসেছেন।

তৃতীয় তলা থেকে এক তলায় নেমে এলাম। এখানে যে রুমটি রয়েছে, যাতে প্রবেশে শুরুতেই নিরাপত্তাকর্মী বাঁধা দিয়েছিল, সেই রুমটা মূলত শরৎ চন্দ্র বসুর স্মৃতি রক্ষার্থে তৈরী। বাংলার ইতিহাসে স্বতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এই কিংবদন্তী ব্যক্তির। বললে অত্যুক্তি হবেনা, তাঁর আস্কারা ও সমর্থনেই বাঙালি পেয়েছিলো নেতাজীর মতো নক্ষত্র। এই রুম প্রদক্ষিণ শেষে পুনরায় চোখ পড়লো বারান্দায় রাখা নেতাজী প্রতিকৃতি ও তাঁর ব্যবহৃত গাড়ীর দিকে। এগুলোর সাথে ছবি উঠানোর সময়ই খেয়াল করলাম চঞ্চল চৌধুরীও তাঁর পরিবারের সাথে এসেছেন। বুঝতে বাকি রইলো না, দু বন্ধুই পরিবার সমেত একযোগে বেড়াতে এসেছেন। আমার বাবা আবার চঞ্চলের ভীষণ ভক্ত। তিনি আবার আমার ছোটবোনের ফ্যাকাল্টিরই সিনিয়র। খানিক সময় সেখানে সৌহার্দ্য বিনিময় হলো।

অতঃপর বিদায় পালা। হালকা ফটোশ্যুট শেষে পুনরায় ট্যাক্সি করে নিউমার্কেট এলাকায় চলে এলাম। ফেরার পথে ভিক্টোরিয়া, ময়দান, ব্রিগেড, ইডেন সবই দেখা হলো। তবে, কিছু কথা না বললেই নয়। নেতাজীর মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তির স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত জাদুঘরের অবস্থা আর দশটা সাধারণ জাদুঘরের মতোই মনে হলো। গুটিকয়েক ছবি ও ব্যবহৃত আসবাবপত্র ছাড়া তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছুই সাধারণ মানুষের দেখার ও জানার জন্য রাখা হয়নি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, সেখানে প্রতি তলায় মোতায়েন রাখা নিরাপত্তাকর্মীগণ নেতাজীর সম্পর্কে বলতে গেলে বিশেষ কিছুই জানেন না। আমি খানিক আলাপচারিতায় যা বুঝলাম, প্রত্যেকেই চাকরির সুবাদে এখানে দাড়িয়ে রয়েছেন। এসব কিংবদন্তীগাঁথার বিষয়ে কারুর তেমন জানার আগ্রহও লক্ষ্য করলাম না। দর্শনার্থীদের গাইড করার বিষয়ে এরা নিতান্তই অজ্ঞ ও মূর্খ।

মিউজিয়ামের দায়িত্বে থাকা কেয়ারটেকারকে বললাম, অন্তত একবার হলেও যেনো বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে নির্মিত জাদুঘর ভ্রমণ করে আসেন তিনি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ! বলতে বাধ্য হচ্ছি, নেতাজী জাদুঘর পরিদর্শনের পর বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেলো! একজন রাষ্ট্রনায়কের জাদুঘর কেমন হওয়া উচিত, তা তিনি বাঙালীকে শিখিয়েছেন। নেতাজী ভবনে নির্মিত জাদুঘরটি সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাও তেমন পায়না বলেই ধারণা করি। এত সাদামাটা একটা হাল দেখে মনে দুঃখবোধও কম হলো না! মন থেকে নেতাজীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি থাকলেই কেবল এই সাদামাটা জাদুঘরে চোখের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব। তথাপি, সাধারণ উৎসুক জনতা দেখতে গেলে নিরাশ হয়েই ফিরতে বাধ্য। নেতাজীর বংশধরদের প্রতি এক ধরণের অভক্তি জন্ম নিলো। কী লাভ এত শিক্ষিত হয়ে, যদি নিজের পরিবারের ঐতিহ্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে এত ভয় ও দালালির আশ্রয় নেয়া লাগে! শুধু বড় বড় কথা বললেই নেতা হওয়া যায়না, উত্তরাধিকার পেলেই বিশিষ্ট হওয়া যায়না! এর বড় প্রমাণ মনে হয় নেতাজীর বংশধরগণ।

নেতাজী সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই! বাঙালী তাঁর প্রিয় পুত্র সম্পর্কে সবই জানেন! ইতোপূর্বে আমি নিজেও আমার অনেক লেখনীতে তাঁর সম্পর্কে মুগ্ধতা ও মতামত প্রকাশ করেছি। নেতাজীর বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে মন্তব্য করেছি। আশপাশের সবাইকে বুঝাতে চেয়েছি তাঁর মহত্ব। তাঁর প্রতি হওয়া সকল অবিচার সম্পর্কে সোচ্চার হয়েছি। আমার বাসার সবাই আমার এই পাগলামো সম্পর্কে জানেন। প্রায় ১৩ বছর যাবত যে ব্যক্তিকে নিজের আদর্শিক গুরু মেনে এসেছি, তাঁর বাড়ীতে ভ্রমণ করতে পারাটা আমার জন্য রীতিমতো স্বাপ্নিক। আল্লাহ আমার সে স্বপ্ন পূরণ করেছেন। পরিবারের সবাইকে সঙ্গে করে নেতাজী ভবন পরিদর্শনের সুযোগ আল্লাহ করে দিয়েছেন। সেজন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি শেষহীন কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া!

তবে, স্বপ্নপূরণ ও হতাশার মিশ্র আবেশে বলতে চাই, আবারও ফিরবো এখানে। হয়তো নতুন কোন ইতিহাসের সূচনায় কিংবা পুরোনো ইতিহাসের স্মৃতিমন্থন করতে!

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেহাদ