০২:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

সময় এসেছে মন্ডা’কে জিআই পণ্য বানানোর

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল: সম্প্রতি বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়িকে নিজেদের ‘ভৌগোলিক নির্দেশক’ বা জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন করে নিয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। গত পহেলা ফেব্রুয়ারী ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়, ‘হাতেবোনা ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি পশ্চিমবঙ্গ থেকে উদ্ভূত’। উৎফুল্ল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী সামাজিকমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে এ শাড়ির কারিগরদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ‘টাঙ্গাইল শাড়ি নদীয়া ও পূর্ব বর্ধমানের পণ্য’। এ নিয়ে দুই দেশের সংস্কৃতি সচেতন মানুষের মাঝে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দেশটির এই অদ্ভূত দাবি ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের অনেকেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

আমরা সবাই জানি, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় রাষ্ট্রেই বাঙালী নারীদের আবহমান সাংস্কৃতিক পোশাক হিসেবে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির অবস্থান একেবারেই প্রথম দিকে, তাই স্বভাবতই এই শাড়ির চাহিদা ও বাণিজ্য সব সিজনেই রমরমা। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই শাড়ি বুননের ইতিহাস। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এর ব্যাপক প্রসার হয়। এটি বাংলাদেশের অন্যতম পুরনো একটি কুটির শিল্প।

ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের অনেক তাঁতি সম্প্রদায় টাঙ্গাইল শাড়ির বুননকর্মে জড়িত। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো তাঁতি সম্প্রদায় হলো টাঙ্গাইলের পাথরাইলের বসাক সম্প্রদায়। বাংলাদেশের আরেক ঐতিহ্যবাহী শিল্প মসলিন। এই মসলিন তাঁতিদের বংশধরগণই মূলত টাঙ্গাইলের পুরনো তাঁতি বা কারিগর। তাদের আদি নিবাস ছিল ঢাকা জেলার ধামরাই ও চৌহাট্টায়। তৎকালীন সময়ে দেলদুয়ার, সন্তোষ ও ঘ্রিন্দা এলাকার জমিদারদের আমন্ত্রণে তাঁতিরা টাঙ্গাইল যান এবং পরবর্তীতে সেখানে বসবাস শুরু করেন। অবিভক্ত ময়মনসিংহের মহকুমা টাঙ্গাইলের নামানুসারে এই শাড়ি টাঙ্গাইল শাড়ি পরিচিতি লাভ করে।

তবে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কিছু তাঁতি বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছিলেন। তারাই সেখানে টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরি শুরু করেন। ভিন্ন দেশে বুনন আরম্ভ করলেও শাড়ির নাম তারা একই রাখেন। ফলত, দেশভাগের পূর্ব হতে অদ্যবধি টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি।

আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা, যে পণ্যগুলো ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশেই উৎপাদিত হয়, ভারত নিঃসন্দেহে সবার আগে সেগুলোর স্বত্ব নিজেদের নামে নিবন্ধন করতে চাইবে। খোদ ইউরোপের বিভিন্ন পণ্য নিয়েও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে আইনি লড়াই চলে বছরের পর বছর। এমনকি, বাসমতী চালের স্বত্ব নিয়ে পাকিস্তান, ভারত আর নেপালের আইনি যুদ্ধ চলছে তো চলছেই! তাই, যেহেতু বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে টাঙ্গাইলের শাড়ির সুনাম শতাব্দী প্রাচীন এবং উভয় বঙ্গেই এর বুনন সমানতালে চলছে, তাই এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে ভারত-বাংলাদেশ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকার বিষয়টি স্বাভাবিক বলেই ধরে নেয়া যায়।

একইভাবে, ভারত ইতোমধ্যে বাগিয়ে নিয়েছে রসগোল্লা, নকশিকাঁথা, ফজলি আম ও নারকেলের মোয়ার জিআই স্বত্ব। সুন্দরবনের মধুও ভারতের নিজস্ব পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। জামদানির স্বীকৃতিতেও অর্ধেক ভাগ বসিয়েছে তারা। অথচ একটু সচেতন হলেই এগুলোর স্বীকৃতি সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশের হতে পারত। তাই টাঙ্গাইল শাড়ি কিংবা সুন্দরবনের মধুর জিআই স্বীকৃতি আদায় করে নেয়ায় ভারতকে বিন্দুমাত্র দোষারোপ না করে, নিজেদের ত্রুটি নিয়েই বরং আমাদের আলোচনা করা দরকার এবং একই সঙ্গে যেসব পণ্যের স্বীকৃতি আদায়ে এখনো কোনো দৃশ্যমান কর্মসূচি নেয়া হয়নি, সেগুলো সম্পর্কে দ্রুত পদক্ষেপ করা দরকার।

জানামতে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের মোট ২১টি পণ্য জিওগ্রাফিক্যাল আডেন্টিফিকেশন (জি আই) বা ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। সেগুলো যথাক্রমে, জামদানি শাড়ী, ইলিশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম, বিজয়পুরের সাদা মাটি, দিনাজপুর কাটারীভোগ, কালিজিরা, রংপুরের শতরঞ্জি, রাজশাহী সিল্ক, ঢাকাই মসলিন, রাজশাহী-চাপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম, বাগদা চিংড়ি, শীতল পাটি, বগুড়ার দই, শেরপুরের তুলশীমালা ধান, চাঁপাই নবাবগঞ্জের ল্যাংড়া আম, চাঁপাই নবাবগঞ্জের আশ্বিনা আম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, টাংগাইলের চমচম, কুমিল্লার রসমালাই, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা, বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল।

তবে এখনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ধরাছোয়ার বাইরে রয়েছে, মুক্তাগাছার মণ্ডা, শেরপুরের ছানার পায়েশ, জামালপুরের নকশীকাঁথা এবং মধুপুরের আনারস সহ অসংখ্য বাংলাদেশী পণ্য। ময়মনসিংহের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে নিজ এলাকার পণ্য নিয়ে কথা আমি বলতেই পারি। মুক্তাগাছার মন্ডা বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী সম্পদ। স্বাদ ও ঐতিহ্যে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মণ্ডা ইতোমধ্যে প্রায় দুশো বছর পার করেছে। ১৮২৪ সাল থেকে একইভাবে মণ্ডার সুনাম ধরে রেখেছেন মুক্তাগাছার কারিগররা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার মিষ্টির দোকানে মণ্ডা পাওয়া গেলেও সবাই মোটামুটিভাবে মুক্তাগাছার মণ্ডার স্বাদের কথাই বলেন। বলা বাহুল্য, মিষ্টির জগতে এটা ঐতিহ্যবাহী এক নামই বটে! দুধ, ছানা আর চিনি দিয়ে তৈরি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার এই বিশেষ মিষ্টির জনপ্রিয়তা যে আকাশচুম্বি, তা বলে বোঝানো দুঃসাধ্য।

ভারতে মাসখানেক অবস্থানের সুবাদে দেখেছি, সেখানেও বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে মণ্ডা বেশ জনপ্রিয় মিষ্টান্ন হিসেবে স্বীয় নাম কুড়িয়েছে। বিশেষ করে, কলকাতায় থাকাকালে দেখেছি, ‘মণ্ডা’র নাম নেয়া মাত্র ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার নাম অনায়াসে চলে আসে সেখানকার বাসিন্দাদের মুখে। কিন্তু গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে মণ্ডার মূল সাপ্লাই দেন কোচবিহারের কারিগরেরা।

উল্লেখ্য, মুক্তাগাছার মণ্ডার উদ্ভাবক গোপাল পাল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মণ্ডার দোকান ২০০ বছর ধরে মণ্ডা তৈরির ব্যবসা চলছে বংশানুক্রমে। এখন চলছে সম্ভবত পঞ্চম পুরুষের ব্যবসা। মণ্ডার প্রসারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্তাগাছার জমিদারদের নামও। ময়মনসিংহ জেলা শহর থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার পশ্চিমে মুক্তাগাছা পৌরসভা শহরে জমিদারবাড়ির কাছে, পূর্ব দিকে জগৎ কিশোর রোডে রামগোপাল পাল ওরফে গোপাল চন্দ্র পালের মণ্ডার দোকান। ঐতিহ্যবাহী এই মণ্ডার বিক্রিও একচেটিয়া।

প্রথম মণ্ডা তৈরি নিয়েও একটি চিত্তাকর্ষক জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। রামগোপাল পাল প্রথম এ মণ্ডা তৈরি করেন। ১৮২৪ সালের এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন, তাঁর শিয়রে দাঁড়িয়ে এক সন্ন্যাসী মণ্ডা বানানোর আদেশ দিচ্ছেন। পরে স্বপ্নযোগে কয়েক রাতে সন্ন্যাসী তাঁকে মণ্ডা বানানোর পদ্ধতি শিখিয়ে দেন। গোপাল সন্ন্যাসীর স্বপ্নাদেশে এক শুভ দিনে মণ্ডা তৈরির কাজ শুরু করেন।

কাজ শেষে স্বপ্নে দেখা সেই সন্ন্যাসী স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে মণ্ডা তৈরির চুলায় হাত বুলিয়ে দেন। গোপাল সন্ন্যাসীকে দেখামাত্র পদযুগলে মাথা রেখে ভক্তি জানিয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। সন্ন্যাসী গোপালের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘তোর হাতের তৈরি এই মণ্ডা খেয়ে সবাই সুখ্যাতি করবে, তোর মণ্ডা একদিন পুরো বিশ্বে সেরা মিষ্টি হবে। পুরুষানুক্রমে তুই এই মণ্ডা শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করবি। তোর অবর্তমানে বংশধরদের হাতে এই সুস্বাদু মণ্ডা টিকে থাকবে।’ এর পর থেকে বংশানুক্রমে তৈরি হয়ে আসছে সুস্বাদু এই মণ্ডা।

রামগোপাল মণ্ডা তৈরি করে সর্বপ্রথম  মুক্তাগাছার তৎকালীন মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরীকে আপ্যায়ন করেন। মণ্ডা খেয়ে তৃপ্তি পেয়ে নিয়মিত মণ্ডা দিতে বলেন। মহারাজা সূর্যকান্তের ছেলে শশীকান্তও মণ্ডা খুব পছন্দ করতেন। মুক্তাগাছার জমিদারদের আন্তরিক পৃষ্ঠপোষকতায় মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরীর বাড়ির পূর্বদিকে নির্মাণ করা হয়েছিল গোপাল পালের মণ্ডার দোকানের দালান ঘর। জনশ্রুতি রয়েছে, মণ্ডা ছাড়া নাকি জমিদারদের সকালের খাবার হতো না। আর জমিদারির সব কর্মচারীদের মধ্যাহ্নকালীন জলখাবারেও রাখা হতো এই মণ্ডা।

মণ্ডার মূল দোকানে থাকা একটি পুস্তিকা থেকে জানা যায়, মণ্ডার কারিগর গোপাল পাল ১৭৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার আদি নিবাস মুর্শিদাবাদে। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর মুর্শিদাবাদের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়। তখন গোপাল পালের দাদা শিবরাম পাল এবং তার বাবা রামরাম পাল অনেকের মতো জীবন বাঁচাতে মুর্শিদাবাদ থেকে রাজশাহীতে চলে আসেন। এরপর সেখান থেকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার তারাটি গ্রামে নতুন করে বসবাস শুরু করেন। ১০৮ বছর বয়সে ১৯০৭ সালে মারা যান সুস্বাদু এই মণ্ডার উদ্ভাবক গোপাল পাল।

জানা যায়, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক আলোচনার জন্য মুক্তাগাছার জমিদার বাড়িতে আসতেন উপমহাদেশের বহু খ্যাতিমান ও প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ। এদের মধ্যে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান চন্ত্র রায়, নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু -সহ অনেক অতিথি এই মণ্ডার স্বাদ নিয়েছেন। মুক্তাগাছার মহারাজ শশীকান্ত আচার্য্য একবার রাশিয়ার জোসেফ স্টালিনের কাছে মণ্ডা উপহার পাঠিয়েছিলেন। স্টালিন পত্রযোগে মহারাজ শশীকান্তকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

এছাড়া, পাকিস্তানের সাবেক ফিল্ড মার্শাল ও রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানও ছিলেন মণ্ডার ভক্ত। পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর মোনায়েম খান প্রায়ই তার কাছে মণ্ডা পাঠাতেন। মওলানা ভাসানী মণ্ডা খেতে কয়েকবার মুক্তাগাছায় এসেছেন। একবার চীন সফরে যাওয়ার সময় নেতা মাও সেতুংয়ের জন্য মণ্ডা নিয়ে যান ভাসানী। পাকিস্তান আমলে ময়মনসিংহ ও মুক্তাগাছায় সভা শেষে বঙ্গবন্ধু এই মণ্ডার দোকানে এসেছিলেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ ঢাকায় এলে মুক্তাগাছা থেকে গোপাল পালের মণ্ডা নেওয়া হয়।

এখানে উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গোপাল পালের বংশধররা শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেন। সেখানেও তারা মণ্ডা তৈরি করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তাগাছায় ফিরে এসে সেই একই স্থানে মণ্ডা তৈরি আরম্ভ করেন তারা। কিন্তু, মাঝখানের সময়টায় তাঁদের থেকে এই মন্ডা তৈরীর বিদ্যা রপ্ত করে নেন ভারতীয় অনেক কারিগরও। এখানেই নিহিত মূল ভয়। ইতোমধ্যে মণ্ডার জিআই রেজিস্ট্রেশন পেতে পেটেন্টের দাবি জোরালো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে। জনশ্রুতি রয়েছে, গোপাল পালের রসুইঘরে কাজ করতেন যতীন্দ্রমোহন দে। দেশভাগের পর তিনি কোচবিহারের মাথাভাঙার প্রেমেরডাঙায় চলে যান। প্রয়াত যতীন্দ্রবাবুর উত্তরসূরীদের দাবি, অবিভক্ত বাংলার মুক্তাগাছায় যে ভাবে শিখেছিলেন, সেভাবেই কোচবিহারেই মন্ডা তৈরি শুরু করেন তিনি। পরে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, খুব শীঘ্রই পদক্ষেপ না নিলে, টাঙ্গাইলের শাড়ির মতো একই পরিণতি হতে পারে ময়মনসিংহের মণ্ডার জিআই স্বীকৃতির বেলায়ও। টাঙ্গাইল শাড়ির বেলায় তবুও শান্তনা এই যে, এর জিআই স্বত্ব বা আঞ্চলিক নির্দেশক স্বত্ব এখন ভারতের হলেও এককভাবে টাঙ্গাইল নামের অঞ্চল বাংলাদেশে অবস্থিত। তাই আপিলের সুযোগ যেমন বাংলাদেশের থাকছে, তেমনই এই স্বীকৃতি পুনরুদ্ধার কিংবা যুগ্ম স্বীকৃতির আশা করাটা দুরাশা নয়। কিন্তু, মণ্ডা সহ অন্য ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলোর তড়িৎ স্বীকৃতি আদায় না করতে পারলে, সেটি নিঃসন্দেহে আমাদের খামখেয়ালির বলি হতে চলেছে!

নিজ জ্ঞান ও চিন্তা থেকে বলতে পারি, যদি ভারত আবেদন না-ও করে, তবুও নিজ দেশের পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা হাজারো ঐতিহ্যের সঠিক সম্মান বিধানে বাংলাদেশের সকল জেলা প্রশাসনের উচিত একযোগে সকল গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যের জিআই স্বীকৃতি আদায়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ করা। তবেই সার্থকতা পাবে এই লেখনীর উদ্দেশ্য, পূর্ণতা পাবে লাখো মানুষের মনস্কামনা!

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেহাদ

ট্যাগ:

সময় এসেছে মন্ডা’কে জিআই পণ্য বানানোর

প্রকাশ: ১১:৪৫:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল: সম্প্রতি বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়িকে নিজেদের ‘ভৌগোলিক নির্দেশক’ বা জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন করে নিয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। গত পহেলা ফেব্রুয়ারী ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়, ‘হাতেবোনা ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি পশ্চিমবঙ্গ থেকে উদ্ভূত’। উৎফুল্ল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী সামাজিকমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে এ শাড়ির কারিগরদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ‘টাঙ্গাইল শাড়ি নদীয়া ও পূর্ব বর্ধমানের পণ্য’। এ নিয়ে দুই দেশের সংস্কৃতি সচেতন মানুষের মাঝে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দেশটির এই অদ্ভূত দাবি ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের অনেকেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

আমরা সবাই জানি, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় রাষ্ট্রেই বাঙালী নারীদের আবহমান সাংস্কৃতিক পোশাক হিসেবে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির অবস্থান একেবারেই প্রথম দিকে, তাই স্বভাবতই এই শাড়ির চাহিদা ও বাণিজ্য সব সিজনেই রমরমা। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই শাড়ি বুননের ইতিহাস। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এর ব্যাপক প্রসার হয়। এটি বাংলাদেশের অন্যতম পুরনো একটি কুটির শিল্প।

ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের অনেক তাঁতি সম্প্রদায় টাঙ্গাইল শাড়ির বুননকর্মে জড়িত। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো তাঁতি সম্প্রদায় হলো টাঙ্গাইলের পাথরাইলের বসাক সম্প্রদায়। বাংলাদেশের আরেক ঐতিহ্যবাহী শিল্প মসলিন। এই মসলিন তাঁতিদের বংশধরগণই মূলত টাঙ্গাইলের পুরনো তাঁতি বা কারিগর। তাদের আদি নিবাস ছিল ঢাকা জেলার ধামরাই ও চৌহাট্টায়। তৎকালীন সময়ে দেলদুয়ার, সন্তোষ ও ঘ্রিন্দা এলাকার জমিদারদের আমন্ত্রণে তাঁতিরা টাঙ্গাইল যান এবং পরবর্তীতে সেখানে বসবাস শুরু করেন। অবিভক্ত ময়মনসিংহের মহকুমা টাঙ্গাইলের নামানুসারে এই শাড়ি টাঙ্গাইল শাড়ি পরিচিতি লাভ করে।

তবে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কিছু তাঁতি বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছিলেন। তারাই সেখানে টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরি শুরু করেন। ভিন্ন দেশে বুনন আরম্ভ করলেও শাড়ির নাম তারা একই রাখেন। ফলত, দেশভাগের পূর্ব হতে অদ্যবধি টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি।

আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা, যে পণ্যগুলো ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশেই উৎপাদিত হয়, ভারত নিঃসন্দেহে সবার আগে সেগুলোর স্বত্ব নিজেদের নামে নিবন্ধন করতে চাইবে। খোদ ইউরোপের বিভিন্ন পণ্য নিয়েও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে আইনি লড়াই চলে বছরের পর বছর। এমনকি, বাসমতী চালের স্বত্ব নিয়ে পাকিস্তান, ভারত আর নেপালের আইনি যুদ্ধ চলছে তো চলছেই! তাই, যেহেতু বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে টাঙ্গাইলের শাড়ির সুনাম শতাব্দী প্রাচীন এবং উভয় বঙ্গেই এর বুনন সমানতালে চলছে, তাই এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে ভারত-বাংলাদেশ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকার বিষয়টি স্বাভাবিক বলেই ধরে নেয়া যায়।

একইভাবে, ভারত ইতোমধ্যে বাগিয়ে নিয়েছে রসগোল্লা, নকশিকাঁথা, ফজলি আম ও নারকেলের মোয়ার জিআই স্বত্ব। সুন্দরবনের মধুও ভারতের নিজস্ব পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। জামদানির স্বীকৃতিতেও অর্ধেক ভাগ বসিয়েছে তারা। অথচ একটু সচেতন হলেই এগুলোর স্বীকৃতি সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশের হতে পারত। তাই টাঙ্গাইল শাড়ি কিংবা সুন্দরবনের মধুর জিআই স্বীকৃতি আদায় করে নেয়ায় ভারতকে বিন্দুমাত্র দোষারোপ না করে, নিজেদের ত্রুটি নিয়েই বরং আমাদের আলোচনা করা দরকার এবং একই সঙ্গে যেসব পণ্যের স্বীকৃতি আদায়ে এখনো কোনো দৃশ্যমান কর্মসূচি নেয়া হয়নি, সেগুলো সম্পর্কে দ্রুত পদক্ষেপ করা দরকার।

জানামতে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের মোট ২১টি পণ্য জিওগ্রাফিক্যাল আডেন্টিফিকেশন (জি আই) বা ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। সেগুলো যথাক্রমে, জামদানি শাড়ী, ইলিশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম, বিজয়পুরের সাদা মাটি, দিনাজপুর কাটারীভোগ, কালিজিরা, রংপুরের শতরঞ্জি, রাজশাহী সিল্ক, ঢাকাই মসলিন, রাজশাহী-চাপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম, বাগদা চিংড়ি, শীতল পাটি, বগুড়ার দই, শেরপুরের তুলশীমালা ধান, চাঁপাই নবাবগঞ্জের ল্যাংড়া আম, চাঁপাই নবাবগঞ্জের আশ্বিনা আম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, টাংগাইলের চমচম, কুমিল্লার রসমালাই, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা, বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল।

তবে এখনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ধরাছোয়ার বাইরে রয়েছে, মুক্তাগাছার মণ্ডা, শেরপুরের ছানার পায়েশ, জামালপুরের নকশীকাঁথা এবং মধুপুরের আনারস সহ অসংখ্য বাংলাদেশী পণ্য। ময়মনসিংহের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে নিজ এলাকার পণ্য নিয়ে কথা আমি বলতেই পারি। মুক্তাগাছার মন্ডা বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী সম্পদ। স্বাদ ও ঐতিহ্যে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মণ্ডা ইতোমধ্যে প্রায় দুশো বছর পার করেছে। ১৮২৪ সাল থেকে একইভাবে মণ্ডার সুনাম ধরে রেখেছেন মুক্তাগাছার কারিগররা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার মিষ্টির দোকানে মণ্ডা পাওয়া গেলেও সবাই মোটামুটিভাবে মুক্তাগাছার মণ্ডার স্বাদের কথাই বলেন। বলা বাহুল্য, মিষ্টির জগতে এটা ঐতিহ্যবাহী এক নামই বটে! দুধ, ছানা আর চিনি দিয়ে তৈরি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার এই বিশেষ মিষ্টির জনপ্রিয়তা যে আকাশচুম্বি, তা বলে বোঝানো দুঃসাধ্য।

ভারতে মাসখানেক অবস্থানের সুবাদে দেখেছি, সেখানেও বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে মণ্ডা বেশ জনপ্রিয় মিষ্টান্ন হিসেবে স্বীয় নাম কুড়িয়েছে। বিশেষ করে, কলকাতায় থাকাকালে দেখেছি, ‘মণ্ডা’র নাম নেয়া মাত্র ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার নাম অনায়াসে চলে আসে সেখানকার বাসিন্দাদের মুখে। কিন্তু গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে মণ্ডার মূল সাপ্লাই দেন কোচবিহারের কারিগরেরা।

উল্লেখ্য, মুক্তাগাছার মণ্ডার উদ্ভাবক গোপাল পাল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মণ্ডার দোকান ২০০ বছর ধরে মণ্ডা তৈরির ব্যবসা চলছে বংশানুক্রমে। এখন চলছে সম্ভবত পঞ্চম পুরুষের ব্যবসা। মণ্ডার প্রসারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্তাগাছার জমিদারদের নামও। ময়মনসিংহ জেলা শহর থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার পশ্চিমে মুক্তাগাছা পৌরসভা শহরে জমিদারবাড়ির কাছে, পূর্ব দিকে জগৎ কিশোর রোডে রামগোপাল পাল ওরফে গোপাল চন্দ্র পালের মণ্ডার দোকান। ঐতিহ্যবাহী এই মণ্ডার বিক্রিও একচেটিয়া।

প্রথম মণ্ডা তৈরি নিয়েও একটি চিত্তাকর্ষক জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। রামগোপাল পাল প্রথম এ মণ্ডা তৈরি করেন। ১৮২৪ সালের এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন, তাঁর শিয়রে দাঁড়িয়ে এক সন্ন্যাসী মণ্ডা বানানোর আদেশ দিচ্ছেন। পরে স্বপ্নযোগে কয়েক রাতে সন্ন্যাসী তাঁকে মণ্ডা বানানোর পদ্ধতি শিখিয়ে দেন। গোপাল সন্ন্যাসীর স্বপ্নাদেশে এক শুভ দিনে মণ্ডা তৈরির কাজ শুরু করেন।

কাজ শেষে স্বপ্নে দেখা সেই সন্ন্যাসী স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে মণ্ডা তৈরির চুলায় হাত বুলিয়ে দেন। গোপাল সন্ন্যাসীকে দেখামাত্র পদযুগলে মাথা রেখে ভক্তি জানিয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। সন্ন্যাসী গোপালের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘তোর হাতের তৈরি এই মণ্ডা খেয়ে সবাই সুখ্যাতি করবে, তোর মণ্ডা একদিন পুরো বিশ্বে সেরা মিষ্টি হবে। পুরুষানুক্রমে তুই এই মণ্ডা শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করবি। তোর অবর্তমানে বংশধরদের হাতে এই সুস্বাদু মণ্ডা টিকে থাকবে।’ এর পর থেকে বংশানুক্রমে তৈরি হয়ে আসছে সুস্বাদু এই মণ্ডা।

রামগোপাল মণ্ডা তৈরি করে সর্বপ্রথম  মুক্তাগাছার তৎকালীন মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরীকে আপ্যায়ন করেন। মণ্ডা খেয়ে তৃপ্তি পেয়ে নিয়মিত মণ্ডা দিতে বলেন। মহারাজা সূর্যকান্তের ছেলে শশীকান্তও মণ্ডা খুব পছন্দ করতেন। মুক্তাগাছার জমিদারদের আন্তরিক পৃষ্ঠপোষকতায় মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরীর বাড়ির পূর্বদিকে নির্মাণ করা হয়েছিল গোপাল পালের মণ্ডার দোকানের দালান ঘর। জনশ্রুতি রয়েছে, মণ্ডা ছাড়া নাকি জমিদারদের সকালের খাবার হতো না। আর জমিদারির সব কর্মচারীদের মধ্যাহ্নকালীন জলখাবারেও রাখা হতো এই মণ্ডা।

মণ্ডার মূল দোকানে থাকা একটি পুস্তিকা থেকে জানা যায়, মণ্ডার কারিগর গোপাল পাল ১৭৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার আদি নিবাস মুর্শিদাবাদে। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর মুর্শিদাবাদের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়। তখন গোপাল পালের দাদা শিবরাম পাল এবং তার বাবা রামরাম পাল অনেকের মতো জীবন বাঁচাতে মুর্শিদাবাদ থেকে রাজশাহীতে চলে আসেন। এরপর সেখান থেকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার তারাটি গ্রামে নতুন করে বসবাস শুরু করেন। ১০৮ বছর বয়সে ১৯০৭ সালে মারা যান সুস্বাদু এই মণ্ডার উদ্ভাবক গোপাল পাল।

জানা যায়, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক আলোচনার জন্য মুক্তাগাছার জমিদার বাড়িতে আসতেন উপমহাদেশের বহু খ্যাতিমান ও প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ। এদের মধ্যে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান চন্ত্র রায়, নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু -সহ অনেক অতিথি এই মণ্ডার স্বাদ নিয়েছেন। মুক্তাগাছার মহারাজ শশীকান্ত আচার্য্য একবার রাশিয়ার জোসেফ স্টালিনের কাছে মণ্ডা উপহার পাঠিয়েছিলেন। স্টালিন পত্রযোগে মহারাজ শশীকান্তকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

এছাড়া, পাকিস্তানের সাবেক ফিল্ড মার্শাল ও রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানও ছিলেন মণ্ডার ভক্ত। পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর মোনায়েম খান প্রায়ই তার কাছে মণ্ডা পাঠাতেন। মওলানা ভাসানী মণ্ডা খেতে কয়েকবার মুক্তাগাছায় এসেছেন। একবার চীন সফরে যাওয়ার সময় নেতা মাও সেতুংয়ের জন্য মণ্ডা নিয়ে যান ভাসানী। পাকিস্তান আমলে ময়মনসিংহ ও মুক্তাগাছায় সভা শেষে বঙ্গবন্ধু এই মণ্ডার দোকানে এসেছিলেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ ঢাকায় এলে মুক্তাগাছা থেকে গোপাল পালের মণ্ডা নেওয়া হয়।

এখানে উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গোপাল পালের বংশধররা শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেন। সেখানেও তারা মণ্ডা তৈরি করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তাগাছায় ফিরে এসে সেই একই স্থানে মণ্ডা তৈরি আরম্ভ করেন তারা। কিন্তু, মাঝখানের সময়টায় তাঁদের থেকে এই মন্ডা তৈরীর বিদ্যা রপ্ত করে নেন ভারতীয় অনেক কারিগরও। এখানেই নিহিত মূল ভয়। ইতোমধ্যে মণ্ডার জিআই রেজিস্ট্রেশন পেতে পেটেন্টের দাবি জোরালো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে। জনশ্রুতি রয়েছে, গোপাল পালের রসুইঘরে কাজ করতেন যতীন্দ্রমোহন দে। দেশভাগের পর তিনি কোচবিহারের মাথাভাঙার প্রেমেরডাঙায় চলে যান। প্রয়াত যতীন্দ্রবাবুর উত্তরসূরীদের দাবি, অবিভক্ত বাংলার মুক্তাগাছায় যে ভাবে শিখেছিলেন, সেভাবেই কোচবিহারেই মন্ডা তৈরি শুরু করেন তিনি। পরে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, খুব শীঘ্রই পদক্ষেপ না নিলে, টাঙ্গাইলের শাড়ির মতো একই পরিণতি হতে পারে ময়মনসিংহের মণ্ডার জিআই স্বীকৃতির বেলায়ও। টাঙ্গাইল শাড়ির বেলায় তবুও শান্তনা এই যে, এর জিআই স্বত্ব বা আঞ্চলিক নির্দেশক স্বত্ব এখন ভারতের হলেও এককভাবে টাঙ্গাইল নামের অঞ্চল বাংলাদেশে অবস্থিত। তাই আপিলের সুযোগ যেমন বাংলাদেশের থাকছে, তেমনই এই স্বীকৃতি পুনরুদ্ধার কিংবা যুগ্ম স্বীকৃতির আশা করাটা দুরাশা নয়। কিন্তু, মণ্ডা সহ অন্য ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলোর তড়িৎ স্বীকৃতি আদায় না করতে পারলে, সেটি নিঃসন্দেহে আমাদের খামখেয়ালির বলি হতে চলেছে!

নিজ জ্ঞান ও চিন্তা থেকে বলতে পারি, যদি ভারত আবেদন না-ও করে, তবুও নিজ দেশের পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা হাজারো ঐতিহ্যের সঠিক সম্মান বিধানে বাংলাদেশের সকল জেলা প্রশাসনের উচিত একযোগে সকল গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যের জিআই স্বীকৃতি আদায়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ করা। তবেই সার্থকতা পাবে এই লেখনীর উদ্দেশ্য, পূর্ণতা পাবে লাখো মানুষের মনস্কামনা!

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেহাদ