১২:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

টাঙ্গাইলের সাকরাইল জমিদারি

নবাবজাদা সুরজিত কুমার নিয়োগীর সঙ্গে লেখক

তানভীর সরকার টুটুল: টাঙ্গাইল এর সন্তোষ অধ্যুষিত এলাকা সাকরাইল এর জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন কালিদাস মুন্সি। নামটি দেখে পাঠক মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, হিন্দু নাম কালিদাস আবার মুন্সী হয় কি করে? উত্তরটা জানা গেলো মুন্সিবাড়ি স্টেটের সর্বশেষ জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ নিয়োগী চৌধুরীর ছেলে তথা জমিদারপুত্র সুরজিত কুমার নিয়োগীর কাছ থেকে।

কালিদাস মুন্সি নিয়োগী চৌধুরী সর্বপ্রথম ষোড়শ এই সাকরাইলে জমিদারি প্রথা চালু করেন এবং জমিদার বাড়ির নামকরণ করেন ‘মুন্সিবাড়ি স্টেট’। কালিদাস নিয়োগীর বংশনাম ছিল মূলত ‘মুন্সেফ’, অর্থাৎ কালিদাস মুন্সেফ। সুরজিত নিয়োগীর মতে, তখনকার সময়ে বাঙালিরা মুন্সেফ শব্দটা উচ্চারণ করতে পারত না। মুন্সেফ কে বলত মুন্সি। তাই কালিদাস মুন্সেফের নাম হয় কালিদাস মুন্সি।

ইংরেজরা যখন ভারতবর্ষে আসে, তখন তারা বাংলা বুঝত না। এজন্য তাদের দোভাষীর প্রয়োজন হত। এদিকে কালিদাস মুন্সেফ কলকাতায় পড়াশোনা করায় ইংরেজিতে ছিলেন পারদর্শী। তাই ইংরেজরা সাকরাইল অঞ্চলে কালিদাস মুন্সেফ কে দোভাষী হিসেবে নিযুক্ত করে।

সাকরাইলে কালিদাস মুন্সেফ তার বাবা জগদ্দাস মুন্সেফ এর নাম অনুসারে সপ্তদশ শতকে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখনো জরাজীর্ণ অবস্থায় সাকরাইলের মাটিতে টিকে আছে। বর্তমানে মন্দিরকে ঘিরে রেখেছে বটগাছের লতা-পাতা ঘেরা আগাছা।

দেখলেই বোঝা যায়, মন্দিরটি ছিল শিবমন্দির। মন্দিরের বেদীতে কষ্টিপাথরের তিনটি শিবলিঙ্গ ছিল। মাঝের শিবলিঙ্গটি ছিল আকারে তুলনামূলক বড়। ১৯৮১ সালে মন্দির থেকে শিবলিঙ্গ তিনটি চুরি হয়ে যায়। সুরজিত কুমার নিয়োগীর মতে বেদীর নিচে বাক্স ভর্তি গুপ্তধন লুকায়িত ছিল, যেটা শিবলিঙ্গের সাথেই চুরি হয়।

টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের (প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৮০ ইং) প্রথম প্রধান শিক্ষক গোবিন্দ নিয়োগী ছিলেন এই মুন্সিবাড়ি স্টেট এরই কৃতিসন্তান, যিনি পালকিতে ও হাতির পিঠে করে স্কুলে যেতেন। এছাড়া, তৎকালীন সময়ে এই বাড়িরই সন্তান ধীরেন্দ্রনাথ নিয়োগী ছিলেন দারুন অভিনেতা। তিনি এবং তার পরিবার প্রায়ই কলকাতায় যাত্রা, পালাগান, নাটক দেখতে যেতেন। এরই অনুকরণে সাকরাইলেও মাঝেমাঝেই মঞ্চ নাটকের আয়োজন করা হত।

সুরজিত নিয়োগীর মতে, একদিন সন্তোষের রাজা শ্রী মন্মথনাথ রায় চৌধুরী নাটক দেখতে সাকরাইলে এসেছিলেন হাতির পিঠে করে। ধীরেন্দ্রনাথ নিয়োগীর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে সন্তোষ স্টেটে তাকে চাকরি দিতে চাইলে, তিনি তা করতে নারাজ হন। কারণ একজন জমিদার হিসেবে এই চাকরি করাটা তাঁর সাজে না!

ধীরেন্দ্রনাথ নিয়োগীর পারদর্শীতা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে সন্তোষ এর রাজা মন্মথনাথ তার স্টেটে সর্বপ্রথম লোন প্রথা চালু করেন এবং লোন অনুমোদনের গুরু দায়িত্ব ধীরেন্দ্রনাথ নিয়োগীর হাতে তুলে দেন। সাকরাইল অঞ্চল তথা টাঙ্গাইল এর সর্বশেষ এই জমিদার ১৯৬২ সালে মারা যান এবং টাঙ্গাইল অঞ্চল থেকে জমিদারিপ্রথা সম্পূর্নরুপে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

সর্বশেষ জমিদারের জীবিত পুত্র সুরজিত নিয়োগী ১৯৫৬ সালে টাঙ্গাইল এর বিবেকানন্দ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। সেই সময় বিবেকানন্দ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন সুবোধ দে। সুরজিত নিয়োগী বর্তমানে টাঙ্গাইলেই বসবাস করছেন।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ট্যাগ:

টাঙ্গাইলের সাকরাইল জমিদারি

প্রকাশ: ১২:৪০:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

তানভীর সরকার টুটুল: টাঙ্গাইল এর সন্তোষ অধ্যুষিত এলাকা সাকরাইল এর জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন কালিদাস মুন্সি। নামটি দেখে পাঠক মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, হিন্দু নাম কালিদাস আবার মুন্সী হয় কি করে? উত্তরটা জানা গেলো মুন্সিবাড়ি স্টেটের সর্বশেষ জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ নিয়োগী চৌধুরীর ছেলে তথা জমিদারপুত্র সুরজিত কুমার নিয়োগীর কাছ থেকে।

কালিদাস মুন্সি নিয়োগী চৌধুরী সর্বপ্রথম ষোড়শ এই সাকরাইলে জমিদারি প্রথা চালু করেন এবং জমিদার বাড়ির নামকরণ করেন ‘মুন্সিবাড়ি স্টেট’। কালিদাস নিয়োগীর বংশনাম ছিল মূলত ‘মুন্সেফ’, অর্থাৎ কালিদাস মুন্সেফ। সুরজিত নিয়োগীর মতে, তখনকার সময়ে বাঙালিরা মুন্সেফ শব্দটা উচ্চারণ করতে পারত না। মুন্সেফ কে বলত মুন্সি। তাই কালিদাস মুন্সেফের নাম হয় কালিদাস মুন্সি।

ইংরেজরা যখন ভারতবর্ষে আসে, তখন তারা বাংলা বুঝত না। এজন্য তাদের দোভাষীর প্রয়োজন হত। এদিকে কালিদাস মুন্সেফ কলকাতায় পড়াশোনা করায় ইংরেজিতে ছিলেন পারদর্শী। তাই ইংরেজরা সাকরাইল অঞ্চলে কালিদাস মুন্সেফ কে দোভাষী হিসেবে নিযুক্ত করে।

সাকরাইলে কালিদাস মুন্সেফ তার বাবা জগদ্দাস মুন্সেফ এর নাম অনুসারে সপ্তদশ শতকে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখনো জরাজীর্ণ অবস্থায় সাকরাইলের মাটিতে টিকে আছে। বর্তমানে মন্দিরকে ঘিরে রেখেছে বটগাছের লতা-পাতা ঘেরা আগাছা।

দেখলেই বোঝা যায়, মন্দিরটি ছিল শিবমন্দির। মন্দিরের বেদীতে কষ্টিপাথরের তিনটি শিবলিঙ্গ ছিল। মাঝের শিবলিঙ্গটি ছিল আকারে তুলনামূলক বড়। ১৯৮১ সালে মন্দির থেকে শিবলিঙ্গ তিনটি চুরি হয়ে যায়। সুরজিত কুমার নিয়োগীর মতে বেদীর নিচে বাক্স ভর্তি গুপ্তধন লুকায়িত ছিল, যেটা শিবলিঙ্গের সাথেই চুরি হয়।

টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের (প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৮০ ইং) প্রথম প্রধান শিক্ষক গোবিন্দ নিয়োগী ছিলেন এই মুন্সিবাড়ি স্টেট এরই কৃতিসন্তান, যিনি পালকিতে ও হাতির পিঠে করে স্কুলে যেতেন। এছাড়া, তৎকালীন সময়ে এই বাড়িরই সন্তান ধীরেন্দ্রনাথ নিয়োগী ছিলেন দারুন অভিনেতা। তিনি এবং তার পরিবার প্রায়ই কলকাতায় যাত্রা, পালাগান, নাটক দেখতে যেতেন। এরই অনুকরণে সাকরাইলেও মাঝেমাঝেই মঞ্চ নাটকের আয়োজন করা হত।

সুরজিত নিয়োগীর মতে, একদিন সন্তোষের রাজা শ্রী মন্মথনাথ রায় চৌধুরী নাটক দেখতে সাকরাইলে এসেছিলেন হাতির পিঠে করে। ধীরেন্দ্রনাথ নিয়োগীর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে সন্তোষ স্টেটে তাকে চাকরি দিতে চাইলে, তিনি তা করতে নারাজ হন। কারণ একজন জমিদার হিসেবে এই চাকরি করাটা তাঁর সাজে না!

ধীরেন্দ্রনাথ নিয়োগীর পারদর্শীতা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে সন্তোষ এর রাজা মন্মথনাথ তার স্টেটে সর্বপ্রথম লোন প্রথা চালু করেন এবং লোন অনুমোদনের গুরু দায়িত্ব ধীরেন্দ্রনাথ নিয়োগীর হাতে তুলে দেন। সাকরাইল অঞ্চল তথা টাঙ্গাইল এর সর্বশেষ এই জমিদার ১৯৬২ সালে মারা যান এবং টাঙ্গাইল অঞ্চল থেকে জমিদারিপ্রথা সম্পূর্নরুপে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

সর্বশেষ জমিদারের জীবিত পুত্র সুরজিত নিয়োগী ১৯৫৬ সালে টাঙ্গাইল এর বিবেকানন্দ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। সেই সময় বিবেকানন্দ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন সুবোধ দে। সুরজিত নিয়োগী বর্তমানে টাঙ্গাইলেই বসবাস করছেন।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।